এককালে ঠেলাগাড়িতে মোমো বিক্রি করা বাঙালি মেয়ে আজ বাংলার বুকে ১৭ খানা মোমোর দোকানের মালিক। এই লড়াকু মেয়েটা আজ চাকরি দিয়েছে আরও ৫০ জন মহিলাকে। প্রথমদিন মোমো বিক্রি করতে এসে ৭ প্লেট মোমোও বিক্রি হয়নি। আজ সে ১০০০ প্লেটেরও বেশি মোমো বিক্রি করে। ভূগোলে গ্র্যাজুয়েশন করে ঠেলাতে মোমো বিক্রি করতে বসে কতই না কথা শুনতে হয়েছিল লোকের থেকে। একজন পড়াশোনা জানা মেয়ে, শেষমেশ ঠেলাগাড়িতে ঘুরে ঘুরে মোমো বিক্রি করবে। সমাজের চোখে এটা মোটেই সহজ ছিল না। সমাজের কাছে ছোটো ব্যবসাটা তাচ্ছিল্য স্বরূপ দেখায়।
মৌমিতার বাবা দীলিপ মিস্ত্রি সামান্য মুদির দোকান চালায়। ওই দোকান চালিয়েই বাবা কষ্ট করে মানুষ করেছেন মৌমিতা ও দীপান্বিতাকে। করোনার সময় থেকেই বাবার দোকানের বিক্রি কমতে থাকে। তাই বাবার পাশে দাঁড়াতে ইএম বাইপাসের পাশে অজয়নগর এলাকায় মোমো বিক্রি করা শুরু করেন মৌমিতা আর দীপান্বিতা। ঠেলাগাড়ির মাথায় অল্প ছাউনি দিয়ে ছোট্ট দোকান। প্রথম দিনেই বৃষ্টির সম্মুখীন হয় মৌমিতার এই মোমোর দোকান। এমনকি বৃষ্টির জল লেগে যাচ্ছিল স্টোভও। সেখান থেকে ফিরে এল মৌমিতা।
কলকাতার অজয় নগরের বাসিন্দা মৌমিতা। নেতাজি নগর কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ার জন্য কলেজের পরে আর পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি। এদিকে মমতা আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বেশিরভাগই সরকারি চাকরি করেন। মৌমিতার ইচ্ছা ছিল সেরমই কিছু করার। কিন্তু ২০২০ সালের লকডাউন মৌমিতার জীবন পাল্টে দেয়। লকডাউনে চাকরি চলে যায় মৌমিতার। এদিকে বাড়িতে এতগুলো মানুষ! আবার পক্ষে আর মুদির দোকান চালিয়ে এতগুলো মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। চাকরির অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে মোমোকেই হাতিয়ার করে নেন মৌমিতা। ঠিক করেন একটি মোমোর দোকান দেবেন।
চাকরি করে যে অল্প কিছু টাকা জমে ছিল সেই সেভিংস ভেঙে একটি ঠেলাগাড়ি কেনেন মৌমিতা। রোজ সন্ধ্যায় ঠেলাগাড়িতে মোমো বিক্রি করা শুরু করেন মৌমিতা। মোমোর দোকানের নাম রাখেন মোমো চিত্তে। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ওই ঠেলাগাড়ি থেকে হোম ডেলিভারির অর্ডার বাড়তে থাকে। সেই সময় মৌমিতা ও দীপান্বিতা দুজনে মোমো বানাতেন। আর সেগুলো ডেলিভারি করে দিয়ে আসত মৌমিতার প্রেমিক বিদ্যুৎ হালদার, যিনি বর্তমানে মৌমিতার স্বামী। ঠেলাগাড়িতে বেশ কিছুদিন চলার পরে মৌমিতা সিদ্ধান্ত নিলেন এবার একটি দোকান ভাড়া নেবেন। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হাইল্যান্ড পার্কের সামনে একটা ছোট্ট দোকান নিয়ে মোমো চিত্তের অফিশিয়াল পথ চলা শুরু হল। মৌমিতার লড়াইয়ে সব সময় পাশে পেয়েছেন বিদ্যুৎ বাবুকে। বিদ্যুৎ বাবু নিজে একটি চাকরি করতেন, পরে চাকরি ছেড়ে মৌমিতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে শুরু করেন।
আজ হাইল্যান্ড পার্ক, হালতু, মানিকতলা, বেলেঘাটা, ঠাকুরপুকুর, সেলিমপুর, টেংরা, বারুইপুর, সোনারপুর, রাজারহাট। কলকাতার বাইরে সোদপুর,বালি, বাগনান, আন্দুল, সালকিয়াতেও মোমো চিত্তের আউটলেট রয়েছে। হাওড়ার শিবপুর ও শ্রীরামপুরেও নতুন আউটলেট খুলতে চলেছে মোমো চিত্তে। এই ১৭ খানা দোকানের রান্নাঘর বাদ দিয়ে বাকি সব কিছুই মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত। একদিন যারা মৌমিতা দীপান্বিতার মোমোর ঠেলাগাড়ি নিয়ে তাচ্ছিল্য করত আজ তারাই ওদেরকে নিয়ে গর্ব করে।





