আর জি করে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় গোটা বাংলা এখন উত্তাল। দিকে দিকে চলছে বিক্ষোভ, আন্দোলন। চিকিৎসকদের প্রতিবাদে রাজ্যে প্রায় বন্ধ স্বাস্থ্য পরিষেবাও। এই আন্দোলন প্রথমে চিকিৎসকরা শুরু করলেও এখন তা গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে। গোটা রাজ্যের মানুষ নেমেছে প্রতিবাদে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আজ, ১৪ আগস্ট রাতে প্রতিবাদে নামছেন রাজ্যের মহিলারা।
এই আন্দোলন এখন আর শুধুমাত্র বাংলার গণ্ডির মধ্যে আটকে নেই। তা জাতীয় স্তরেও ছড়িয়েছে। আজ, ১৪ আগস্ট প্রাক-স্বাধীনতা রাতে প্রতিবাদে নামছেন রাজ্যের মহিলারা। রাজ্যের নানান প্রান্তে এদিন রয়েছে ‘রাত দখলের’ কর্মসূচি। রাতের রাস্তা থাকবে এদিন মেয়েদের দখলে। কিন্তু এই কর্মসূচির ডাক প্রথম কে দিয়েছিলেন? জানেন?
আর জি করের ঘটনার প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথম এই কর্মসূচির ডাক দেন রিমঝিম সিনহা। তিনিই প্রথম সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছিলেন, “আরজি করের ঘটনার পর আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলাম। প্রতিটা সময়ে আমার মনে হচ্ছিল যে নাইট ডিউটি করতে গিয়ে একজন মহিলা চিকিৎসকের এই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা যারা কাজে বেরচ্ছি, তারা কোন সময়ে, কোথায় নিরাপত্তা হিসাবে কিছু পেতে পারি? সেই জায়গা থেকেই আমি ১০ অগস্ট ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম যে ১৪ অগস্ট রাতে আমি নারী স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দাবিতে বসব। সেটা ভেবেই আমি কল দিয়েছিলাম, কিন্তু দারুণ সাড়া পাই”।
রিমঝিম আরও লিখেছিলেন, “আসলে দীর্ঘদিন ধরেই আমরা দেখে আসছি নারী কী পোশাক পরবে, কাকে, কখন বিয়ে করবে, তা সমাজ স্থির করে দেয়। কোন নারী শিষ্ঠ নারী, কে নষ্ট- তা স্থির করে দেওয়া হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, উল্টোদিকে আমরা কিছুই পাচ্ছি না। সেই জায়গা থেকে দাঁড়িয়েই আমি এই ডাক দিয়েছিলাম। প্রচুর জায়গায় এই ডাক ছড়িয়ে গিয়েছে। আমি আপ্লুত। আমি ১৪ তারিখ রাতে যাদবপুর ৮বি-তে থাকছি। আমার বিনীত অনুরোধ, দয়া করে কেউ রাজনৈতিক পতাকা নিয়ে আসবেন না”।
কে এই রিমঝিম সিনহা?
এই রিমঝিম সিনহা কলেজে পড়ার সময় থেকেই ছাত্র ও মহিলা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জানা গিয়েছে, ২০১৩ সালে বিধাননগর মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। এরপর অশোক হল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই ২০১৮ সালে সোশিওলজিতে স্নাতক ও ২০২০ সালে সোশিওলজিতেও মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনে অনেক আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন তিনি। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ডাকে রাজ্যের অগণিত মহিলারা তাও আবার এক অরাজনৈতিক কর্মসূচিতে এভাবে সাড়া দেবেন, তা কী কল্পনা করতে পেরেছিলেন রিমঝিম?
এই বিষয়ে এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিমঝিম জানান, “ফেসবুকে যখন এই ডাকটা দিই আশা করিনি এরকম ভাইরাল হবে। আশাবাদী ছিলাম যে কলকাতা বুকে অনেক মানুষ আসবেন। এখন যে পর্যায় এই ডাকটা পৌঁছে গিয়েছে ৫০ থেকে ৬০ জন কোঅর্ডিনেটরের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলতে পেরেছি। এই কোঅর্ডিনেটরের স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের এলাকায় এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। তাঁরা সবাই চাইছেন রাত জাগতে। প্রচুর মহিলা তো বটেই পুরুষরা যোগ দিচ্ছে। একটা ঘটনার পর শুধু বিচার চেয়ে থেমে গেলে এই ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকবে। ঔদ্ধত্য বাড়বে। কোনও সিস্টেমের পরিবর্তনের ডাক দেওয়া হলে নানা ধরনের কথা শুনতে হয়। আমাদের মোটামুটি প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয় সঠিক নারী হওয়া কাকে বলে। কোন চুলের ছাঁটে, কোন জামাটা পরলে সুশীল নারী হতে পারব সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সারা রাত বাইরে থাকার পরিকল্পনা নিই, তাহলে কথা শুনতে হবে। যাঁরা এই কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন মনে হয় তাঁরা নিজেরাও জানেন, হয়ত তাঁদের পরিজনদের, বাইরের মানুষের থেকে এই ধরনের কথা শুনতে হবে”।





