কখনও ভিড় বাসে সামান্য ধাক্কা লেগে তুমুল মারামারি, কখনও আবার রাস্তায় গাড়ি ওভারটেক করা নিয়ে হাতাহাতি—সমাজ যেন ধীরে ধীরে সহিষ্ণুতা হারাচ্ছে। একে অপরকে সাহায্য করা তো দূরের কথা, সামান্য সহনশীলতাও যেন মানুষের মধ্যে অবশিষ্ট নেই। ক্ষোভ, হিংসা আর প্রতিশোধস্পৃহার আগুনে জ্বলছে সমাজ। এই প্রবণতার মর্মান্তিক এক নিদর্শন দেখা গেল সম্প্রতি মোহালিতে, যেখানে একটি তুচ্ছ পার্কিং সংক্রান্ত বিবাদ প্রাণ কেড়ে নিল এক বিজ্ঞানীর!
বিজ্ঞান, গবেষণা, নতুন উদ্ভাবনের জন্য যাঁরা নিজেদের উজাড় করে দেন, তাঁদের সুরক্ষা নিয়ে আমরা কতটা চিন্তিত? এক তরুণ গবেষকের স্বপ্ন, এক অসুস্থ বিজ্ঞানীর বেঁচে থাকার লড়াই থেমে গেল শুধুমাত্র পার্কিং নিয়ে ঝামেলার জেরে! পার্কিং সমস্যা বড় শহরগুলিতে নতুন নয়, কিন্তু সেটি নিয়ে সংঘর্ষের মাত্রা ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা—যে কোনও মেট্রো শহরেই প্রায়শই পার্কিং নিয়ে লড়াইয়ের ঘটনা সামনে আসে, তবে এবার যা ঘটল, তা গোটা দেশকে হতবাক করে দিয়েছে।
মোহালির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (IISER)-এ কর্মরত ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী বিজ্ঞানী ডঃ অভিষেক স্বর্ণকার। ঝাড়খণ্ডের ধানবাদের বাসিন্দা অভিষেক সুইজারল্যান্ডে গবেষণা শেষ করে সম্প্রতি ভারতে ফিরেছিলেন। IISER-এ যোগ দেওয়ার পর থেকে মোহালির সেক্টর ৬৭-তে ভাড়া বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই পার্কিং নিয়ে প্রতিবেশী মন্টির সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ চলছিল। মঙ্গলবার রাতে সেই বিবাদ চরমে ওঠে।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, অভিযুক্ত মন্টির গাড়ি অভিষেকের বাইকের সামনে পার্ক করা ছিল। অভিষেক বাইরে এসে প্রতিবাদ করেন এবং গাড়ি সরানোর জন্য বলেন। তখনই দু’জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। অভিযোগ, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মন্টির স্ত্রীও ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে, মন্টি অভিষেককে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন এবং তাঁকে ঘুষি মারতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর প্রতিবেশীরা বেরিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন, তবে ততক্ষণে অভিষেক মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছিলেন।
অভিষেক স্বর্ণকার সম্প্রতি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছিলেন এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিস চলছিল। ঘটনার পর গুরুতর অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পুলিশ ইতিমধ্যে অভিযুক্ত মন্টির বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা দায়ের করেছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য তল্লাশি চালাচ্ছে। তদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি অভিসন্ধি ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ‘কাটমানি না দিলে বিল নেই!’ তৃণমূল পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ শাসকদলেরই নেতার!
এই মর্মান্তিক ঘটনা আরও একবার স্পষ্ট করে দিল, আমরা ধৈর্য হারাচ্ছি, সংযম হারাচ্ছি, পারস্পরিক সম্মান হারাচ্ছি। আজ একটি পার্কিং বিবাদের জেরে প্রাণ গেল এক বিজ্ঞানীর, কাল হয়তো আরও বড় কিছু ঘটতে পারে। প্রশাসন কি এবার কড়া পদক্ষেপ নেবে? সমাজ কি শিখবে, ক্ষুদ্রতম কারণেও অকারণে হিংসার আশ্রয় না নিতে? সেই উত্তর খুঁজছে অভিষেক স্বর্ণকারের পরিবার, বন্ধুরা এবং গোটা সমাজ!






