দানের টাকায় টিকে থাকা, ঋণের জালে জর্জরিত অর্থনীতি—এক সময় যে পাকিস্তান নিজের বিমান সংস্থাকে জাতীয় গর্ব হিসেবে তুলে ধরত, আজ সেই দেশই অচলাবস্থার মুখে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত, অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা আর বছরের পর বছর লোকসানের চাপে পাকিস্তানের জাতীয় ক্যারিয়ার পিআইএ এখন এমন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বেঁচে থাকার একমাত্র পথ বেসরকারিকরণ। কিন্তু এত বড় পরিবর্তনের দিকে পাকিস্তান কীভাবে ঠেলে গেল?
অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেবের বক্তব্য অনুযায়ী, পিআইএ বিক্রির প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, এবং ২৩ ডিসেম্বর নিলামের দিনও ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, শর্ত সাপেক্ষ আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের বেলআউট প্যাকেজও পাকিস্তানকে বিমান সংস্থার ৫১ থেকে ১০০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইসলামাবাদের দাবি—অর্থভাণ্ডার প্রায় খালি; আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত তাদের নিতে হচ্ছে। আগ্রহীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইতিমধ্যে বৈঠকও করেছেন।
কিন্তু যে পিআইএ একসময় দেশের পরিচয় হয়ে উঠেছিল, তার এই দুর্দশার কারণ কী? ১৯৬০–৭০ দশকে বিশ্বের অন্যতম সেরা এয়ারলাইন্স হিসেবে পরিচিত ছিল পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স। কলকাতার ব্যবসায়ী আদমজী হাজি দাউদ ও মির্জা আহমেদ ইস্পাহানীর হাত ধরে ১৯৪৬ সালে একটি বেসরকারি সংস্থা হিসেবে শুরু হয়েছিল যাত্রা। পরবর্তীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—মোট ৬০টি রুটে উড়ত পিআইএ। অথচ আজ ৩০টির মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিমানই পরিচালনাযোগ্য নয়। বিনিয়োগ নেই, আধুনিকীকরণ নেই—সব মিলিয়ে লোকসানই দাঁড়িয়েছে ২.৫ বিলিয়ন ডলারে।
এই অবস্থায় বেসরকারিকরণই যেন একমাত্র পথ। তবে আগের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ব্লু ওয়ার্ল্ড সিটির ৩৬ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব ন্যূনতম মূল্যসীমার ধারে কাছেও পৌঁছয়নি। ঋণের পাহাড়, পুরনো বিমান, অতিরিক্ত জনবল—সব মিলিয়ে আগ্রহীর সংখ্যা কম। যদিও এবার সরকার ৭৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্তে আশাবাদী। পিআইএর মুখপাত্রও বলছেন—এই সংস্থার টিকে থাকতে বৃহৎ বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা কেবল বেসরকারি খাত থেকেই আসতে পারে।
আরও পড়ুনঃ West Bengal Economic Crisis : তৃণমূলের আমলেই বাংলায় শিল্পের ‘মহাপলায়ন’! ৬,৮৯৫ সংস্থা রাজ্য ছাড়ল—রাজ্যসভায় নির্মলার বিস্ফোরক তথ্য, উত্তরে তীব্র অস্বস্তিতে তৃণমূল!
তবে পরিস্থিতি যতই সংকটময় হোক, পাকিস্তান সরকার এখন বিমানবন্দর পরিষেবাকেও বেসরকারিকরণের পথে এগোচ্ছে। শুরু হচ্ছে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। প্রশ্ন উঠছে—যে পিআইএর কাছে আজ প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিমানই নেই, সেই সংস্থাকে ঠিক কতটা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারবে এই সিদ্ধান্ত? আপাতত উত্তর মিলছে না। শুধু প্রমাণ মিলছে একটি সত্যের—যে সংস্থা একসময় ছিল জাতীয় গর্ব, সেটিও সময়ের নিয়মে আজ পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রের বোঝায়।





