বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্বেগ যেন আরও গভীর হচ্ছে। একের পর এক ঘটনায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সংখ্যালঘু পরিবারগুলির মধ্যে। কখনও বাড়িঘরে আগুন, কখনও প্রকাশ্যে খুন, আবার কখনও লুটপাট—এই সমস্ত ঘটনাই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, আদৌ কি নিরাপদ সেখানে সংখ্যালঘু জীবন? সাম্প্রতিক একটি ঘটনা ফের সেই আশঙ্কাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার নান্দিরগাঁও ইউনিয়নের বাহোর গ্রামে সম্প্রতি এক হিন্দু শিক্ষকের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আক্রান্ত শিক্ষকের নাম বীরেন্দ্র কুমার দে। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘ঝুনু স্যার’ নামেই পরিচিত। অভিযোগ, গভীর রাতে তাঁর বাড়িতে আগুন লাগানো হয়। ঘটনায় সৌভাগ্যবশত পরিবারের কেউ হতাহত না হলেও মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। আগুনে বাড়ির একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই পরিবারটি চরম ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
এই ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। তবে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অতীত অভিজ্ঞতা তাঁদের আশাহত করেছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর আগেও চট্টগ্রামে একাধিক হিন্দু বাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনায় দায় রাজনৈতিক দলগুলির ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল। পুলিশ দাবি করেছিল, নির্বাচনের আগে অশান্তির পরিবেশ তৈরি করতেই এমন ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—এই দোষারোপের রাজনীতিতে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন?
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরু থেকেই একের পর এক হিংসার ঘটনায় উত্তপ্ত বাংলাদেশ। ২ জানুয়ারি থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮ থেকে ৯ জন হিন্দু খুন হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। ১২ জানুয়ারি ফেনিতে খুন হন ২৮ বছরের অটোচালক সমীরকুমার দাস। তার আগে ১০ জানুয়ারি সিলেটে প্রাণ হারান জয় মহাপাত্র। ৫ জানুয়ারি যশোরে গুলি করে খুন করা হয় ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক রানাপ্রতাপ বৈরাগীকে। একই দিনে নরসিংদীতে মুদি দোকানে খুন হন ব্যবসায়ী শরৎ চক্রবর্তী মণি। এছাড়াও একাধিক জায়গায় ডাকাতি, জমি দখল, ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
আরও পড়ুনঃ West Bengal SIR : ফর্ম ৭ নিয়ে দিনভর বিক্ষোভে উত্তাল রাজ্য, মৃত ভোটার ইস্যুতে চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন,১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ল সময়!
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পুরনো পরিসংখ্যান নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসেই সংখ্যালঘুদের উপর অন্তত ৫১টি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ ও মিথ্যা অভিযোগে নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলি মিলিয়ে ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে চিত্রটা। রাজনৈতিক দোষারোপের মাঝেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই হিংসার শেষ কোথায়? আর কতদিন আতঙ্কের মধ্যে বাঁচতে হবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের?






