দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল, মোদী সরকার ভারতের মসনদে দ্বিতীয়বারের জন্য বসেছে। এই একবছরে কতটা বদলেছে রাজনৈতিক চালচিত্র? একবছর আগে বিশাল ড্রিমলাইনারে বাংলা থেকে দিল্লী এসেছিলেন বঙ্গ বিজেপির ১৮ জন সাংসদ। বিজেপির ঝুলিতে তখন তিনশোর বেশি আসন। অন্য দলের ওপর নির্ভরতা শূন্য। কার্যত সাফল্যের শিখরে গেরুয়া শিবির। সেই সাফল্য উদযাপনে সামিল হয়েছেন বাংলার ১৮ জন বিজেপি সাংসদ। এসবই নজিরবিহীন। একদিকে মন্ত্রী হওয়ার হাতছানি, অন্যদিকে ২০২১-এর উজ্জ্বল সম্ভাবনার চূড়ান্ত আশাবাদ। রাজ্য বিজেপি নেতারা ধরেই নিয়েছিলেন, ভোটের আগে দিল্লি যেভাবে বাংলা বাংলা করেছে, এবার মন্ত্রিসভা গঠনের সময় নিশ্চয়ই তাদের আলাদাভাবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। বাবুল সুপ্রিয় ছিলেন প্রতিমন্ত্রী, এবারও তিনি প্রতিমন্ত্রীই হলেন। সঙ্গে যোগ হল নতুন নাম দেবশ্রী চৌধুরী, তিনিও প্রতিমন্ত্রী। আশাহত হল বঙ্গ বিজেপি।
দিল্লি খালি হাতে ফিরিয়েছে, এবার পাওনা-গন্ডা বুঝে নিতে হবে বাংলার মাটিতেই কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা খেল দল। মুকুল রায়ের হাত ধরে বিজেপির সদর দফতর দিল্লি গিয়ে যোগ দিলেন মনিরুল। পত্রপাঠ প্রতিবাদের ঝড় উঠল। দিকে দিকে গণ ইস্তফার হুমকি। পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর। হস্তক্ষেপ করল আরএসএস। সিদ্ধান্ত হল পরিস্থিতি সামাল দিতে মনিরুলকে আড়াল করে দাও। দল প্রকাশ্যে কোনও সম্পর্ক রাখবে না তার সঙ্গে। শুধু মনিরুল নয়, এক্কেবারে তৃণমূলের কায়দায় মুকুল রায় শুরু করলেন বিপক্ষ শিবির ধ্বংসের কাজ। উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক পুরসভায় ফাটল ধরালেন মুকুল।
কিন্তু শেষ হাসি হাসল না বিজেপি। সব পুরসভাই ফের দখলে নিল তৃণমূল। বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব কাটাছেঁড়া বৈঠকে স্বীকার করে নেন,এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল করেছে দল। কারণ, সরকারি শক্তির সঙ্গে সম্মুখ সমরে পেরে ওঠা যাবে না, সেটা বোঝা উচিত ছিল। এর ফলে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে আসার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটা থমকে গেল পুরোপুরি। বিজেপি নেতৃত্বও পরে মনে করে, পুরসভাগুলো পুনর্দখল করে তৃণমূল নিজেদের ঘরেও পজিটিভ বার্তা দিতে পারল।
গেরুয়া শিবিরের জন্য আর এক আতঙ্কের নাম প্রশান্ত কিশোর। দল যখন সিন্ডিকেট ইস্যুতে শাসক দলকে অনেকটাই কোণঠাসা করে ফেলেছে, তৃণমূলে ভাঙন ধরাতে মাঠে ব্যাপক সক্রিয় বিজেপি, ঠিক সেইসময় প্রশান্ত কিশোরকে বাংলার মাটিতে নিয়ে এলেন তৃণমূল নেত্রী। প্রথম দিকে প্রশান্তকে পাত্তাই দিতেন না বিজেপি নেতারা। কিন্তু ধীরে ধীরে বিজেপি নেতারা চায়ের আড্ডায় চাপা স্বরে স্বীকার করতে আরম্ভ করলেন, প্রশান্ত কিন্তু তৃণমূলের নিচুতলার অস্থিরতা অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছেন। একটা বার্তা দলের সর্বস্তরে পৌঁছে গেছে, তৃণমূল ঘর গুছিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। সেইসঙ্গে প্রকাশ্যে চলে এল অসমের এনআরসি তালিকা। দলের সাজানো ঘুঁটি সব ওলটপালট। শুরু হল ড্যামেজ কন্ট্রোল। দফায় দফায় বৈঠক। একাধিকবার কলকাতায় এলেন অমিত শাহ। দল ঘুরে দাঁড়াবার মরিয়া চেষ্টায় সামনে আনল নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় ঘর সাজিয়ে তুলতে এটাই হল বিজেপির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সেই হাতিয়ার নিয়ে গেরুয়া বাহিনী তৃণমূলের মোকাবিলায় সম্মুখ সমরে যখন ব্যস্ত, তখনই হানা দিল করোনা ভাইরাস।
বিজেপি মনে করছে করোনার প্রথম ধাপেই চাল দুর্নীতি তৃণমূলকে শুরুতেই ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। তাদের দাবি, শুধু খাবার চাল নয়, করোনা মোকাবিলায় সরকারের কৌশলী চাল মানুষকে রুষ্ট করে তুলেছে। সেইসঙ্গে আমফান পরবর্তী ঘটনাবলীর জেরে এখন অনেকটাই অ্যাডভান্টেজে আছে গেরুয়া শিবির। লকডাউনের ফলে দলের কোনও প্রকাশ্য কর্মসূচি নেই, ফলে প্রতিদিন চলছে ভিডিও বৈঠক। রাজনৈতিক ঘটনাবলীর চুলচেরা বিশ্লেষণ সঙ্গে রণকৌশল তৈরির কাজ। সূত্রের খবর, নির্দিষ্ট সময়ে ভোট হবে ধরে নিয়েই নিজেদের ঘুঁটি সাজাতে আরম্ভ করেছেন গেরুয়া নেতৃত্ব। বলা হয়েছে, সমস্ত বিধানসভায় সম্ভাব্য প্রার্থী কারা হতে পারেন, কাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি, দ্রুত তার একটা তালিকা তৈরি করতে হবে। যার জয়ের সম্ভাবনা বেশি, সে যদি শাসক দলেরও হয়, সেই নামটাও অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। অর্থাৎ সেই প্রতিপক্ষের দুর্গ ভেঙে নিজের প্রাসাদ নির্মাণের পুরনো কৌশলকেই আঁকড়ে ধরার ইঙ্গিত দিয়ে কৌশল রচনায় এখন ব্যস্ত বিজেপি।





