কেন জামাইয়ের হাতে বাঁধা হয় ফুলের ডোর, জল ছিটিয়ে পাখার হাওয়া ও তিনবার ষাট বলার কারণই বা কী? জেনে নিন

আজ, ৫ই জুন। এবছর এদিনেই পড়েছে জামাইষষ্ঠী। জামাইষষ্ঠী একটি লৌকিক প্রথা। এই ষষ্ঠী আবার অরণ্য ষষ্ঠী নামেও পরিচিত। মা ষষ্ঠী আসলে সন্তানের দেবী। সন্তানের সুখ ভাগ্য কামনা করে বা সন্তান লাভের আশায় মা ষষ্ঠীর পুজো করা হয়ে থাকে।

ষষ্ঠী পুজোর সঙ্গে জামাইষষ্ঠী প্রথা জড়িত। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত্নহ্য জামাই ষষ্ঠী। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য রচনার সময়কাল থেকেই বাংলার জামাইষষ্ঠীর রীতি মেনে চলা হয়ে থাকে।

কেন পালন করা হয় জামাইষষ্ঠী?

স্বামীর বাড়িতে মেয়ে যাতে সুখে থাকে, সেই কামনা করেই মায়েরা এই ষষ্ঠী পালন করেন। আসলে আগেকার দিনে বহুবিবাহ প্রথা চালু ছিল। তাই জামাইকে খুশি করতে তাঁকে আদর যত্ন করে আপ্যায়ন করা হত এই দিনে। মেয়ে যাতে নিঃসন্তান না থাকে, সেই প্রার্থনাও করেন মায়েরা ষষ্ঠী দেবীর কাছে।

কথিত রয়েছে, আগেকার দিনে মেয়েদের পুত্রসন্তান না হওয়া পর্যন্ত বাপেরবাড়ি আসতে পারতেন না মেয়েরা। আর সেই সময় অনেক ছোটো বয়সে বিয়ে দেওয়া হত মেয়েদের। অনেক সময় ছোটো বয়সে প্রসবের কারণে মা অথবা শিশুর মৃত্যু হত। অনেক বছর ধরেই মেয়ের মুখ দেখতে পারতেন না তাঁর মা-বাবা।

সেই কারণে মেয়ের মুখ দেখার জন্যই প্রচলিত হয় এই জামাইষষ্ঠীর রীতি। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে জামাইকে আমন্ত্রণ করে আদর-আপ্যায়ন করা হয়। এই তিথিতে অন্তত বছরে একবার হলেও বিবাহিতা মেয়ে-জামাইকে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারতেন মেয়ের মা-বাবা। এর ফলে মেয়ের মুখটি বছরে একবার হলেও সন্তুষ্ট হতেন মা-বাবা। আর মেয়ে যাতে শীঘ্রই পুত্রবতী হয়, সেই কামনাও করতেন মা ষষ্ঠীর কাছে।  

ষষ্ঠী পজোর রীতিঃ

ষষ্ঠী পূজোতে লাগে আম পাতা, তালপাখার পাখা, ধান, দূর্বা, পাঁচ থেকে নয় রকমের ফল, ফুল এবং বেলপাতা, সাদা সুতো ও হলুদ।

শাস্ত্র অনুযায়ী, এই পুজোয় কাঁঠালপাতার ওপর পাঁচ, সাত বা নয় রকমের ফল কেটে সাজিয়ে রাখা হয়। তবে এর মধ্যে অপরিহার্য হল করমচা। সঙ্গে থাকে ১০৮টি আঁটি বাঁধা দূর্বা। জামাই ষষ্ঠীর দিনে ষষ্ঠী পুজোর জন্য ভোরবেলা স্নান সেরে ঘটে জল ভরেন শ্বাশুড়িরা। এই ঘটের ওপর রাখা হয় আমপাতা। পাশে থাকে তালপাতার পাখা।

একটি সুতো হলুদে রাঙিয়ে তাতে ফুল, বেলপাতা দিয়ে গিট বেঁধে তৈরি করা হয়। একে ষষ্ঠীর ডোর বলা হয়ে থাকে। এবার দেবী ষষ্ঠীর পুজোর পালা। সকালে কাটা ফলের ডালি, সঙ্গে ফুল, দূর্বা, ষষ্ঠীর ডোর দিয়ে দেবী ষষ্ঠীর থানে অর্থাৎ স্থানে পুজো দিয়ে আসার রীতি পালন করেন শাশুড়ি মায়েরা।

জামাই বাড়িতে এলে তাঁর কপালে দইয়ের ফোঁটা দেওয়া হয়। সেই দূর্বার আঁটি ঘটের জলে ভিজিয়ে তালপাতার সঙ্গে ধরে তাঁকে হাওয়া করা হয়। এতে তাঁর নিজস্ব সন্তানও বাদ যান না। এবার জামাইয়ের কবজিতে ষষ্ঠীর ডোর বেঁধে পাখার হাওয়া দিয়ে শ্বাশুড়ি ষাট-ষাট-ষাট বলে ধান ও দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। এরপর জামাইকে দেওয়া হয় নতুন জামাকাপড়। আর দুপুরে তো থাকে নানান ব্যঞ্জনের মহাভোজ।

তবে এই তিনবার ষাট বলার মধ্যে ও হাতে ডোর বাঁধার মধ্যে বিশেষ কিছু অর্থ রয়েছে। সেগুলি হল-

  • তিন বার ষাট বলার অর্থ দীর্ঘায়ু কামনা করা। সব বিপদ থেকে সন্তান যেন রক্ষা পায়, সেই উদ্দেশেই শ্বাশুড়িয়া তিনবার ষাট বলে থাকেন।
  • ফুল, বেলপাতা দিয়ে হলুদ-তেল মাখানো সুতো বেঁধে দেওয়ার মধ্য দিয়ে উভয় পরিবারের পারস্পরিক বন্ধন এবং মেয়ের সঙ্গে জামাইয়ের বন্ধন যাতে অটুট থাকে তা কামনা করা হয়।
  • জামাই ষষ্ঠীতে ব্যবহৃত ধান সমৃদ্ধি ও বহু সন্তানের প্রতীক। অন্য দিকে দূর্বাকে চিরসবুজ ও চির সতেজতার ধারক ও বাহক মনে করা হয়।
  • আবার পাখায় জল ছিটিয়ে তা দিয়ে জামাইকে হাওয়া করে তাঁর সমস্তবিপদ দূর করার, শান্ত করার কামনা সিদ্ধ করেন শ্বাশুড়ি মায়েরা। হাওয়া করার মধ্য দিয়ে ষষ্ঠীকে শান্ত বা ঠান্ডা রাখা হয়।

আরও অন্যান্য খবর