মহানায়কের হাত ধরেই পর্দায় অভিষেক, দুর্ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল মুখ, লড়াইকে জয় করেই টলিপাড়ার সেরা খলনায়িকা হয়ে ওঠেন সংঘমিত্রা ব্যানার্জি

প্রায় তিন বছর ধরে বাংলা ছবির জগতে দাপিয়ে কাজ করেছেন সংঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়। মূলত খলনায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছেন তিনি। এই অভিনেত্রী জীবনের শেষ কটা দিন অন্তরালে রেখেছিলেন নিজেকে, কারো সাথেই সে রকম ভাবে যোগাযোগ রাখেননি। এমনকি তার মৃত্যুর খবরও মিডিয়া টলিপাড়াকে জানাতে বারণ করে গিয়েছিলেন তিনি। শেষকৃত্যের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরেই খবর দেওয়া হয় সকলকে। 

১৯৫৬ সালের ৮ ই আগস্ট বেনারসে এক ব্যবসায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই অভিনেত্রী। ‌তার বাবা সুভাষ কুমার মুখোপাধ্যায় ও মা সান্তনা মুখোপাধ্যায়। বেনারসের জন্ম হলেও পরে চলে আসেন কলকাতায়। পড়ুয়া হিসেবে খুব খারাপ ছিলেন না তিনি। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সংস্কৃতে গ্রাজুয়েট পাস করেন তিনি। মাস্টার্স করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পড়াশোনার পাশাপাশি নাচেও পারদর্শী ছিলেন সংঘমিত্রা। তিনি ক্লাসিক্যাল নাচের তালিম নিয়েছিলেন ভারতনাট্যমের গুরু থান্কমুনি কুট্টির কাছ থেকে। রাম গোপাল ভট্টাচার্য, নটরাজ কৃষ্ণান, এমনকি বেলা অর্ণবের কাছ থেকেও তিনি নাচের প্রশিক্ষণ নেন। 

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স করা কালীন মহানায়ক উত্তম কুমারের নজরে আসেন তিনি। উত্তম কুমার তার পরিচালিত শেষ ছবি কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ দেন সংঘমিত্রাকে। এই ছবিতে বেগম পারভিন সুলতানার গাওয়া গানে লিপ দিয়ে রাতারাতির জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তখনও পেশাগতভাবে অভিনেত্রী হওয়ার ইচ্ছা ছিল না তার। 

১৯৮১ সালে উমানাথ ভট্টাচার্য তাকে সুযোগ দেন অশ্লীলতার দায়ে ছবিতে অভিনয় করার জন্য। ছবিটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায় তারপরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তারপরে বহু ছবিতে অভিনয় করেছেন সংঘমিত্রা। সবকিছুর মাঝেও খলনায়িকার চরিত্রে তার অভিনয় ছিল অনবদ্য। সে সময় রঞ্জিত মল্লিকের সাথে তার জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পরস্পর নতুন ছবি করতে থাকেন এই জুটি। পরপর বিধিলিপি, শতরূপা ছোট বউ, লোফার ইত্যাদি চরিত্রে রঞ্জিত মল্লিককের স্ত্রীর ভূমিকায় সংঘমিত্রাকে কাস্ট করতে থাকেন পরিচালকেরা। শুধুমাত্র সিনেমা নয় নাটক থিয়েটার সিরিয়াল ও করেছেন এই অভিনেত্রী। রেডিও নাটকে তার অবদান অনস্বীকার্য। 

২০০০ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় তার সারা শরীর। প্রাণে বেঁচে গেলেও, আঘাত লেগে মুখে চোয়াল ভেঙে যায়। অনেকেই ভেবেছিলেন আর পর্দায় দেখা যাবে না সংঘমিত্রাকে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার ছ সপ্তাহ পর শুটিং ফ্লোরে ফেরেন তিনি। দুর্ঘটনার পর তিনি অভিনয় করেছিলেন সাথী ছবিতে। 

পর্দা নেই খলনায়িকা বাস্তব জীবনে ছিলেন খুবই সংসারী। বিয়ে করেন এলাহাবাদবাসী জয়ন্ত ব্যানার্জীকে। তারা এক পুত্র ও পুত্রবধূকে নিয়ে সুখী পরিবার ছিল সংঘমিত্রা ব্যানার্জীর। পরবর্তীতে তার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে। তবে একথা টলি পাড়ার কেউই জানতেন না। সহানুভূতি, আর্থিক সাহায্য কখনোই চাননি তিনি। নীরবে, চুপিসারে সকলের অলক্ষ্যে চলে যেতে চেয়েছিলেন, এই ছিল তার শেষ ইচ্ছে। ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে ২০১৬ সালে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। 

RELATED Articles