আজ এপিজে আবদুল কালামের জন্মদিন, জানুন সমাজ বদলের কারিগর এ পি জে আব্দুল কালামের জীবন কাহিনী

তিনি ভারত বদলের কারিগর। তিনি মানব জীবনের রুপকার। তাঁর হাত ধরেই ভারতবাসী শিখেছে স্বপ্ন দেখতে,নিজেদের বিশ্বাস করতে। তিনি তাঁর অসামান্য আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক চেতনার মাধ্যমে এক সুতোয় গেঁথেছেন বিভিন্ন ধর্ম, মতে বিভক্ত এই ভারতভূমিকে। তিনি ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি এবং স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক এপিজে আবদুল কালাম। আজ তাঁর ৮৯ তম জন্মবার্ষিকী।

তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম গ্রাম, দাক্ষিণাত্যের প্রায় শেষ সীমায় ১৯৩১ সালের ১৫ই অক্টোবর একটি হতদরিদ্র তামিল মুসলিম মাঝির পরিবারে জন্ম নেন ভারতবর্ষের সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালাম। সম্পূর্ণ নাম “আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আব্দুল কালাম।“

দারিদ্র্যের জেরে রঙিন স্বপ্ন নয় কঠিন রূঢ় বাস্তব ধরা দেয় শিশুটির চোখের সামনে। পড়াশুনায় যে খুব তুখোড় ছিল ছেলেটি, তা নয়, তবে শেখার ইচ্ছা ছিল অদম্য। আর এই ইচ্ছাশক্তির পাঠ তিনি নিজের কথার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকেও পড়িয়েছেন।

তিনি বলতেন “আমাদের সবার মধ্যে একরকম ক্ষমতা থাকে না, একথা ঠিক। তবে আমাদের প্রত্যেকের কাছেই একই রকমের সুযোগ থাকে যাতে আমরা নিজেদের ক্ষমতা বুঝতে পারি ও তার উপরে কাজ করতে পারি।“

তাঁর কথায় “আপনার মূলধন হল আপনার চিন্তাশক্তি, আপনার বেছে নেওয়া রাস্তা হল আপনার নির্মাণক্ষমতা; এবং আপনার সমস্যার একমাত্র সমাধান হল পরিশ্রম।“ ব্যক্তিগত জীবনে বহু বাঁধার মুখে পরেছেন তিনি। কিন্তু থামেননি। নিজের পড়ার খরচ চালাতে লোকের বাড়িতে কাগজ বিলি করেছেন। অল্প বয়স থেকেই সামলেছেন পরিবারের দায়িত্ব। তিনি দমে যাননি। স্বপ্ন দেখেছিলেন আকাশ ছোঁয়ার। আর তাইতো বলেছেন –“স্বপ্ন দেখা ছাড়বেন না। স্বপ্নই আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতাকে শক্তি যোগায়। আর আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতাই আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যায়।“ তাঁর কথায়,

“ব্যর্থতার আশঙ্কা করা একটি অসুখ। আর এই অসুখের ওষুধ হল আত্মবিশ্বাস এবং পরিশ্রম। পরিশ্রম করে যান, সঙ্গে নিজের উপরে বিশ্বাস রাখুন, আপনার জীবনে এগিয়ে যাওয়া কেউ আটকাতে পারবে না।”

জাত, ধর্ম নির্বিশেষে ভারতবাসীকে শিক্ষা দেওয়া এই মানুষটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত অসচ্ছল পরিবার থেকে উঠে এসেও পরবর্তী জীবনে তার অর্জন নিয়ে কখনোই অহংকারী হননি। তিনি বলতেন, “এ সব তো ঈশ্বরেরই করুণা, তিনি কালাম নামে এক ক্ষুদ্র ব্যক্তির দ্বারা সম্পন্ন করেছেন”। তিনি তার জীবনের সকল অর্জন উদাহরণ হিসেবে রেখে সাধারণ মানুষকে বলে গেছেন,”।

১৯৫৮ সালের কথা। আব্দুল কালাম মাদ্রাজ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এম.আই.টি) থেকে সদ্য এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ গ্রাজুয়েশন শেষ করেছেন। তাঁর চোখ জুড়ে তখন আকাশে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন। ধূসর বিকালে সামুদ্রিক পাখিদের উড়তে দেখে রোমাঞ্চিত হতেন। চূড়ান্ত লোভ ছিল আকাশে ওড়ার। আর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্যই তো ফিজিক্সে বিএসসি শেষ করার পরও ভর্তি হয়েছিলেন এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ।

এরপর তাঁর সামনে দুটি চাকরিতে আবেদনের সুযোগ এলো। একটি বিমান বাহিনীতে, অন্যটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে Directorate of Technical Development and Production – DTD & P(Air)-এ। তিনি দুটিতেই আবেদন করেন। দুটিই বিমান ওড়ানোর স্বপ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে বিমান বাহিনীর চাকরিটি ছিল সরাসরি বিমানের পাইলট হিসেবে, আর অন্যটি বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত কাজ। খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি বিমান বাহিনীর চাকরিটির জন্য অধিক আগ্রহী ছিলেন। ডাক আসে দুই জায়গা থেকেই। দিল্লীতে DTD & P এর ইন্টার্ভিউ সম্পন্ন করে কালাম বিমান বাহিনীর ইন্টার্ভিউ এর জন্য দেরাদুন পৌঁছান। বিমান বাহিনীর ইন্টার্ভিউতে মেধার চাইতে “ব্যক্তিত্বের” উপর বেশী জোর দেওয়া হয়। আটজন অফিসার নিয়োগের জন্য সেখানের পঁচিশজন আবেদনকারীর মধ্যে আব্দুল কালাম নবম হলেন। প্রচণ্ড হতাশা ঘিরে ধরল তাকে, ভেবেছিলেন এ ব্যর্থতার সাথেই হয়তো ভেঙ্গে গেল আশৈশব লালিত স্বপ্ন।

ভেঙ্গে পড়েন আব্দুল। পৌঁছান হৃষীকেশে। সাক্ষাত করেন স্বামী শিবানন্দের সাথে। স্বামীর গৌতম বুদ্ধের মতো অবয়ব, শিশুর সারল্যমাখা হাসি অনেকটাই শান্ত করে আব্দুল কালামের মনকে। তিনি তার সমস্ত মনঃকষ্টের কারণ, তার স্বপ্ন ভঙ্গের কাহিনী খুলে বললেন স্বামী শিবানন্দকে।

স্বামীজীর ক্ষীণ কিন্তু গভীর কণ্ঠস্বর হতে উৎসারিত বাক্যগুলো আব্দুল কালামের হৃদয়কে আশ্চর্যরকম ভাবে পরিপূর্ণ করে দেয়। তিনি আবার ভরসা ফিরে পান। আত্মবিশ্বাসী আব্দুল দিল্লী ফিরে আসেন। DTD & P এ তার ইন্টার্ভিউ এর ফলাফল জানতে যান। জবাবে হাতে পান এপয়েন্টমেন্ট লেটার। বিমানবাহিনীতে প্রবেশ করতে না পারার সমস্ত ক্ষোভ দূর করে তিনি এখানে সিনিয়র সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন।

INCOSPAR এ আব্দুল কালাম সাহচর্য পান ডক্টর বিক্রম সারাভাই এর। নিজের জীবনে যাঁর প্রভাব তিনি পরবর্তীতে সদা স্বীকার করেছেন। এখানেই মূলত তাঁর ‘আব্দুল কালাম’ থেকে কিংবদন্তী হয়ে উঠার পালা শুরু হয়। সে সময়গুলোতে ভারতের কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ ও মিসাইল নির্মাণ সহ বিভিন্ন মিশনে তার সাফল্য-ব্যর্থতার গল্প ও তাঁর চিন্তাধারা অনুপ্রেরণার,অনুকরণীয়ও বটে। শিলংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও তিনি কিন্তু ভারতীয়দের মনে অমর হয়ে থেকে গিয়েছেন।

আজ এই মহান বিজ্ঞানী এবং অসামান্য মানুষের জন্মদিবসে আমাদের টীমের পক্ষ থেকে রইল অপার শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।

Edited By: Arundhati Das

RELATED Articles