আর জি কর কাণ্ডে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় তোলপাড় চারিদিক। নানান মেডিক্যাল কলেজ থেকেই উঠে আসছে থ্রেট কালচার, দুর্নীতি, হেনস্থা, ধমকানি-চমকানির অভিযোগ। এবার আর জি কর আবহেই খোঁজ মিল আরও এক মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী যিনি হেনস্থার শিকার। টিএমসিপি নেতাদের রোষের মুখে পড়েছিলেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটেছে কল্যাণী মেডিক্যাল কলেজে গত ২৪ এপ্রিল। নির্যাতিতা ছাত্রী এক সংবাদমাধ্যমে সবটা জানিয়েছেন। তিনি জানান, কলেজের কনভোকেশনে অংশ নিতে গিয়েই তৃণমূল ছাত্র পরিষদ নেতাদের রোষের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। এই ঘটনায় আলিম বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তিনি। এই আলম বিশ্বাসই মূল হোতা। এর সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজনের নাম করেছেন তরুণী।
তিনি জানান, টিএমসিপির নেতারা মধ্যরাতে তাঁর হোস্টেলের ঘরে ঢুকে শ্লীলতাহানি করেছে। বিছানায় ঠেলে ফেলে নাকে ঘুষি মারা তাঁকে। এমনকি অভিযোগ জানাতে গিয়েও হেনস্থার মুখে পড়তে হয় ওই ছাত্রীকে। অভিযোগ করায় লাগাতার হুমকির মুখে পড়তে হয় তাঁকে ও তাঁর মা-বাবাকেও। মামলা তোলার জন্য তৎকালীন কল্যাণী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ চাপ দিয়েছিলেন বলে দাবী নির্যাতিতার।
তিনি জানান, “সেদিন আমাদের সিনিয়রদের একটি কনভোকেশন পার্টিতে অংশগ্রহণ করার কথা ছিল। সেই নিয়ে আমরা প্র্যাকটিস করতে বসেছিলাম। সে সময়ে ইউনিয়নের কয়েকজন, হস্টেলের দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে। গায়ে হাত তোলে। জিনিসপত্র ওলটপালট করে”।
ওই তরুণীর কথায়, “ওরা বলেছিল, কনভোকেশনে আমরা যেতে পারব না। কারণ ওদের একটা অভ্যন্তরিণ বিবাদ ছিল, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ছিল। সেখানে আমরা যেহেতু করতে চেয়েছি, তার জন্যই অ্য়াটাক করা হয়েছিল। আমাদের থ্রেট দেওয়া হয়েছিল, যে আমরা যদি কনভোকেশনে পারফর্ম করি, তাহলে আমাদের অ্যাকাডেমিক্সে হার্ম করা হবে। সাপ্লি করে দেওয়া হবে”।
অন্য এক ছাত্র জানান, “খাগেন মুর্মুই আসলে দরজা ভেঙে ঢুকেছিল। তখন বাইরে থেকে আমারই ব্যাচমেট আলিম, ওঁ তখন প্রেসিডেন্ট ছিল, আমাকে চিৎকার করে ডাকছিল। বলছিল বাইরে আয়… তখন বলেছিলাম, কাল সকালে কথা হবে। জোর করে আমার ঘরে সাগেন দরজা ভেঙে ঢোকে, খাট উল্টে দেয়, লাথি মেরে দেয়, জলের ড্রাম দিয়ে আমার মাথায় মারতে যায়”।
নির্যাতিতা চিকিৎসক ছাত্রীর কথায়, “আমাকে ঠেলে বিছানায় ফেলে দেওয়া হয়। হাসানুর জামান নাকে ঘুষি মারে। থ্রেট দিচ্ছিল, পাঁচ বছর তো এখানে থাকতে হবে, আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে কীভাবে থাকবি? যেরকম ভয় পেয়েছিলাম সেদিন, কখনও পাইনি। আমাকে বারবার বলা হচ্ছিল, চোখ নামিয়ে রাখ। কিন্তু আমি জাস্ট ওদের চোখে চোখটাই রাখতে পেরেছিলাম সেদিন, মুখে কোনও প্রতিবাদ করতে পারিনি। কারণ আমার শরীরটা কাঁপছিল”।
তিনি জানান, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন তাঁর ছোটবেলা থেকে। কিন্তু সেই চিকিৎসক হতে গিয়ে যে এমন অবস্থার মুখে পড়তে হবে, তা ভাবতেও পারেন নি তিনি। তরুণীর কথায়, “যে সিনিয়রদের আমি দেখেছিলাম, আমি কখনও ভাবিনি, এরকম একটা হিংস্র রূপ দেখতে হবে। যেহেতু এফআইআর করেছিলাম, তার পাল্টা একটা মিথ্যা এফআইআর করা হয়। এখন আদালতে মামলা চলছে। কিন্তু ফোন করে তখন প্রিন্সিপ্যাল স্যার বলতেন, যেন ফোন করে বিষয়টা মিটিয়ে নেওয়া হয়”।
ওই ছাত্রীর আইনজীবী বলেন, “ওই মেয়েটিকে তো ঘরে ঢুকে মারা হয়েছিল, একজন মহিলার গায়ে হাত দেওয়া মানেই শ্লীলতাহানি করা। আমাকেও থ্রেট করেছিলেন আগের প্রিন্সিপ্যাল, বলেছিলেন, মেয়েটার কেসটা তুলে নেওয়া জন্য। আমাকেও টাকার অফার করা হয়েছিল। মেয়েটির বাবাকেও হুমকি দেওয়া হয়”।
এই অভিযোগ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত চিকিৎসক ছাত্রনেতা আলিম বিশ্বাস জানান, “আমি এই ঘটনার সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নই। আমাকে জড়ানো হয়েছে। ওই সময়ে আমি সভাপতি ছিলাম। কেউ হয়তো আমাকে অপদস্থ করতে চাইছেন। এই আরজি কর কাণ্ডের আবহে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে অনেক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন”।
আরও পড়ুনঃ ‘রেপ-টেপ সব জায়গাতেই হয়…’, আর জি কর নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে বিপাকে, লন্ডনে বাতিল ডোনা গাঙ্গুলির নাচের অনুষ্ঠান
এই ঘটনায় তৎকালীন অধ্যক্ষ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমি কোনও চাপ দিইনি। ছেলেমেয়েদের মধ্যে ঝামেলা হচ্ছিল। দুজনের মধ্যে ঝামেলা হয়েছিল, তারপর দুপক্ষই বলেছিল, ঝামেলা মিটিয়ে নেবে।






