প্রথমে যাদবপুরের স্বপ্নদীপ, এবার আর জি করের তরুণী চিকিৎসক, স্বাধীনতা দিবসের মাসেই নিরাপত্তাহীনতার জেরে বলি ২ ‘তাজা প্রাণ’

মাসটা আগস্ট। এই মাসের ১৫ তারিখে স্বাধীনতা পেয়েছিল আমাদের দেশ। কত কত স্বাধীনতা সংগ্রামীর ঝরা রক্তের মধ্যে দিয়েই স্বাধীন দশের তকমা জুটেছিল ভারতের ভাগ্যে। কিন্তু এখনও নানান ঘটনার চাক্ষুষ করলে যেন একটাই প্রশ্নে মনের মধ্যে বারবার ফিরে আসে যে সত্যিই কী স্বাধীন হয়েছে ভারতবর্ষ। যে দেশকে স্বাধীন করতে কত কত তাজা প্রাণ বলিদান হয়েছে, সেই দেশে এখনও প্রতিনিয়ত তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে শুধুমাত্র কিছু গাফিলতির জেরে।

স্বপ্নদীপ কুণ্ডু! নামটা চেনা চেনা ঠেকছে কী? হ্যাঁ, সেই স্বপ্নদীপ কুণ্ডু যে কিছু রঙিন স্বপ্ন বুকে বেঁধে সবেমাত্র জীবনের পথ চলতে শুরুই করেছিল। কিন্তু স্বপ্নদীপের স্বপ্নপূরণের পথে যে তাঁর স্বপ্নের কলেজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ই কাঁটা  হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়ত স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি আঠারোর কোটায় না পৌঁছনো ছেলেটা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিনিয়র দাদা’দের র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছিল স্বপ্নদীপকে। হোস্টেলের বারান্দা থেকে পড়ে গিয়ে সেদিন সমস্ত স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় স্বপ্নদীপের। এখনও তাঁর সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের সুবিচারের আশায় তাঁর মা-বাবা। ছেলেকে কী ন্যায় বিচার পাবে, সেই আশা নিয়েই দিন কাটছে এখন তাদের।

তাদের মতোই হতভাগা আরও এক মা-বাবা। সদ্য হারানো চিকিৎসক মেয়ের জন্য যেন পাথর হয়ে গিয়েছেন মা। যে মেয়ে চিকিৎসক হয়ে সকলের দুঃখ-যন্ত্রণা দূর করতে চেয়েছিল, সেই মেয়েই একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে ছেড়েছে পৃথিবী। তাঁর শরীরটাকে আঁচড়ে-কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে মানুষরূপী পশু। নারকীয় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে চিরনিদ্রায় আরও এক তরতাজা প্রাণ!

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, কথা হচ্ছে আর জি কর হাসপাতালের সেই তরুণী চিকিৎসককে নিয়ে যার ন্যায় বিচারের জন্য লড়ছে গোটা রাজ্য। বড় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আর জি করে রোগীর সেবা করতে ঢুকেছিলেন সেই তরুণী। কিন্তু সেই হাসপাতাল থেকেই যে তাঁর ক্ষতবিক্ষত লাশ বের হবে, তা হয়ত কল্পনাও করেন নি তিনি। ৩৬ ঘণ্টা টানা ডিউটি করার পর একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সেমিনার হলে গিয়েছিলেন তিনি। সেই যে একটু ঘুমনোর জন্য সেমিনার হলে ঢুকলেন, সেখান থেকে বের হল তাঁর চিরঘুমে চলে যাওয়া শরীরটা। এক পশুর নারকীয় অত্যাচারে শেষ হয়ে গেলেন তিনি। তাঁর শরীরে তকমা লাগল ‘ধর্ষিতা’র।

খুব অদ্ভুতভাবেই এই দুই ঘটনাই ঘটেছে আগস্ট মাসে। গত বছরের আগস্ট মাসে প্রাণ যায় স্বপ্নদীপের আর এই আগস্ট মাসে মৃত্যু হয় তরুণী চিকিৎসকের। দু’জনের মৃত্যুর ন্যায় বিচারের জন্যই গোটা রাজ্যে শোরগোল। স্বপ্নদীপের দোষীরা ধরা পড়লেও এখনও সেভাবে শাস্তি পায় নি তারা। এদিকে তরুণী চিকিৎসকের এক দোষী ধরা পড়েছে বটে। তার কী শাস্তি হয়, এখন সেটাই দেখার। স্বপ্নদীপের ক্ষেত্রে যেমন দোষীর সংখ্যা একাধিক, তেমনই তরুণী চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও দোষী একা নন, সংখ্যা একাধিক বলেই মনে করা হচ্ছে।

দুটো তাজা প্রাণ, একজন তো সবে জীবনের পথ চলতে শুরুই করেছিল, আর অন্যজন সবেমাত্র কর্মজীবনে সামান্য সাফল্য পেতে শুরু করেছিল। আর দু’জনের স্বপ্নই থেকে গেল অধরা। স্বপ্নদীপের মৃত্যুতেও সেদিন বারান্দায় কোনও সিসিটিভি ছিল না আর তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুতেও সেমিনার হলে কোনও সিসিটিভি ছিল না। স্বপ্নদীপের দোষ ছিল, সে সিনিয়রদের কথা মানে নি, তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে নি আর তরুণী চিকিৎসকের দোষ ছিল, তিনি একজন মহিলা হয়ে রাতে একা সেমিনার হলে গিয়েছিলেন।

আসলে, ঘটনা আলাদা হলেও প্রেক্ষাপট খুব আলাদা নয়। সেদিনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছিল এক পড়ুয়া আর এই সময়ও নিরাপত্তার অভাবেই প্রাণ খোয়ালেন এক তরুণী চিকিৎসক। এক বছরে রাজ্যের উপর দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে, কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি আর উন্নত হয়নি। ভোটের সময় কত কত প্রতিশ্রুতি, কত আবেগ, কিন্তু আসল কাজ করার সময় সবই দেখা যায় ‘ফাঁকা ঢোল’। এই নিরাপত্তার অভাবেই হয়ত পরবর্তীতেই এই স্বপ্নদীপ বা তরুণী চিকিৎসকের মতোই আরও কতশত প্রাণ বলি হবে। কিন্তু প্রশাসন বা রাজ্য সরকারের হুঁশ কী আদৌ ফিরবে?

RELATED Articles