খোদ মহানগরের বুকে উঠে এল এক ভয়ানক দৃশ্য। রোগা ছিপছিপে চেহারার এক যুবক। তার বুকের উপর পা রেখে বুট দিয়ে পিষে দিচ্ছেন সবুজ-রঙা পোশাকের পুলিশ অর্থাৎ সিভিক ভলান্টিয়ার বা গ্রিন পুলিশ। যুবক নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ। গতকাল, রবিবার সন্ধ্যায় এমনই এক ঘটনার সাক্ষী থাকল কলকাতার এক্সাইড মোড়।
এই ঘটনা যেন মনে করিয়ে দেয় আমেরিকার মিনিয়াপোলিসের জর্জ ফ্লয়েডের ঘটনা। শ্বেতাঙ্গ পুলিশকর্মীর গলায় হাঁটু গেড়ে বসার জেরে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের। এপরই গোটা বিশ্ব তোলপাড় করে শুরু হয়েছিল ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন।
কিন্তু কলকাতায় এই ধরণের ঘটনা ঘটল কেন? জানা গিয়েছে, এদিন সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় এক্সাইড মোড় থেকে হাওড়াগামী একটি চলন্ত বাস থেকে মহিলার ব্যাগ ছিনতাই করেছিলেন ওই যুবক। বাস থেকে নেমে পালাতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়ে মার খাচ্ছিলেন তিনি। ওই গ্রিন পুলিশ প্রথমে তাঁকে উন্মত্ত জনতার হাত থেকে উদ্ধার করেন। তখন ওই যুবক পালানোর চেষ্টা করতেই তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করেন তিনি। এই কারণেই ফুটপাতে ফেলে পা দিয়ে ঠেসে ধরেছিলেন।
এই ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিন্দার ঝড় উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ওই যুবক যে অপরাধই করে থাকুক না কেন, এভাবে অমানবিকভাবে পা দিয়ে পিষে দেওয়া হবে কেন? এও প্রশ্ন উঠেছে যে উন্মত্ত জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে ওই যুবককে থানায় নিয়ে আসা হল না কেন?
এই প্রশ্নে ওই গ্রিন পুলিশের যুক্তি, “সেই সময় ওই যুববকে সামলানো যাচ্ছিল না। নেশাগ্রস্ত ওই যুবকের গায়ে ভীষণ জোর। তাই বাধ্য হয়েই তার বুকে পা দিয়ে কোনও মতে আটকে রাখা হয়েছিল”।
এই বিষয়ে কলকাতা পুলিশ কমিশনার সৌমেন মিত্র দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি ঘটনাটি দেখে বিব্রত। ঘটনার জন্য দুঃখিত। রাতেই ওই সিভিক ভলান্টিয়ারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ওই সময়ে ওখানে ডিউটিতে থাকা ট্রাফিকের সমস্ত অফিসারদের সোমবার সকালে আমার অফিসে ডেকে পাঠিয়েছি। তাঁরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কী করে এই অমানবিক ঘটনা ঘটল, তা জানতে চাওয়া হবে। অফিসারদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য তদন্ত হবে”।
অন্যদিকে, এই ঘটনা সম্পর্কে তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের মন্তব্য, “পুরো ঘটনাটির বিষয়ে আমি জানি না। নির্দিষ্ট কোনও ফ্রেম দেখে কখনও কিছু বলাও যায় না। তবে এটা বলব, যাঁরা আইনরক্ষার কাজে নিয়োযিত, তাঁদের আইনবহির্ভূত কোনও কাজ করা উচিত নয়”।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করা হয়েছে বিজেপির তরফেও। বিরোধী দলের তরফে মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে ঘটনাটি ঘটেছে বলে সবাই এটার বিষয়ে জানতে পেরেছে। তবে গোটা রাজ্যের নিরিখে এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা এবং মানবাধিকারের পরিস্থিতি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে”।
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বাম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, “জনৈক সিভিক পুলিশ অপরাধীসুলভ আচরণ করেছেন। মানুষের অধিকার হরণ করার সুযোগ কাউকে দেওয়া যায় না”।
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তথা রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন সভাপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, “কোনও অপরাধিকে ধরতে গেলে ধস্তাধস্তি হতেই পারে। তবে পুলিশের থেকে এই নিষ্ঠুর আচরণ কাম্য নয়। এটা অমানবিক। ঘটনার ভিডিও করা হয় বলেই পুলিশের এহেন আচরণ সামনে এল”।





