মেয়েটির নাম কল্পনা মণ্ডল। বয়স মাত্র ১৮। বাড়ি বরানগরে। তাঁকে এই বয়সেই নিতে হয়েছে সংসারের দায়িত্ব।তবে সংসার চালাতে সে যে কাজ করছে তার জন্য এই কন্যেকে ধন্যি মেয়ে বলাই যায়।সে নোয়াপাড়া থেকে ধর্মতলা রুটে চালাচ্ছেন বাস। বাসটির নাম ৩৪সি। মেয়েরা চাইলে কি না পারে ! মেয়েরা শুধু রাঁধবে আর বাচ্চা মানুষ করবে এমন নয় ! দিন বদলেছে। সে যতই পুরুষজাতি রেপের ভয় দেখাক।
মেয়েদেরকে ভয় দেখানো অত সোজা নয়। তারা চাইলে পারে বিশ্বকে জয় করতে। নারীই তো অর্ধেক আকাশ। নোয়াপাড়া মেট্রো স্টেশনের কাছেই বাড়ি কল্পনা মন্ডলের। বাবা ছিলেন ৩৪সি বাসের চালক। ছোট থেকেই কল্পনা যে কোনও গাড়ি চালাতে ভালবাসে। সেই ভালবাসাকেই যে পেশা করে নিতে হবে তা কল্পনাই করতে পারেননি মা মঙ্গলা মন্ডল। কেরিয়ার গড়ার হিসেবে কেন বাস চালানোকেই বেছে নিলেন? কল্পনা বলেন, “বাস চালাব এমন কোনো ভাবনা চিন্তা ছিল না।
এক দুর্ঘটনায় বাবার পায়ে লাগে। এরপর বাবার পক্ষে বাস চালানো সম্ভব হয়না। চিকিৎসা করানোর জন্য অনেক টাকা জোগাড় করতে হবে। অগত্যা, বাস চালানোর শখকে রুটিরোজগারের পথ করে নিলাম”। সারাদিনে একাধিকবার এসপ্ল্যানেড-বরানগর সফর সেরে রাতে ফেরেন বাড়িতে। প্রথমদিকে অনেকেরই মনে প্রশ্ন উঠেছিল আদৌ কল্পনা পারবেন তো? স্বাভাবিকভাবেই পরিবার ছাড়া কাউকেই পাশেও পাননি তিনি।কিন্তু শেষ আট মাসে প্রতিনিয়ত নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন তিনি। তাই এখন পরিজন থেকে প্রতিবেশী সকলেই কল্পনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শুধু তাঁরাই নন, সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে কোটি কোটি তরুণীর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন কল্পনা।
কল্পনা সত্যিই এখন পাকা চালক। কারণ একজন বাস চালক শুধু ভালো বাস চালাতে পারলেই হয় না। বাসের ঘন্টির আওয়াজ শুনে সংকেত বোঝাটাও জরুরি। কি সেই সংকেত? কল্পনা জানে, কন্ডাক্টর একবার ঘন্টি বাজানো মানে পুরুষ যাত্রী নামবে। দু’বার ঘন্টি বাজানো মানে ছাড়তে হবে বাস। তিনবার ঘন্টি বাজানো মানে মহিলা যাত্রী নামবে। সংকেত বুঝেই চালাতে হয় বাস। তার কথায়, “শুরুতে বুঝতে একটু সমস্যা হতো। এখন অভ্যেস হয়ে গিয়েছে।”
এ প্রসঙ্গে কল্পনার বাবা সুভাষ মণ্ডল জানিয়েছেন, এককালে চকলেট কারখানায় কাজ করলেও আর্থিক অনটনের কারণে বন্ধুর সহযোগিতায় বাস চালাতে শুরু করেন তিনি। তখন থেকে বাবার সঙ্গে থেকে মাঝেমধ্যে গোটা বিষয়টি মন দিয়ে দেখত কল্পনা। তবে তা যে কোনওদিন এভাবে কাজে লাগবে তা ভাবতেও পারেননি কেউ। এরপর বছর দুয়েক আগে দুর্ঘটনায় পায়ে চোট পান সুভাষবাবু। সেই থেকে বন্ধ তাঁর বাস চালানো। প্রবল অনটনে স্টিয়ারিং হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন কল্পনা।





