মনোহর ডাকাতের কালীপুজো, দক্ষিণ কলকাতার এই জাগ্রত কালী মন্দিরের ইতিহাস জানলে চমকে যাবেন আপনিও

দক্ষিণ কলকাতার পূর্ণ দাস রোডে রয়েছে এক অনন্য কালীবাড়ি, যার ইতিহাস যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই রহস্যে ভরা। নাম তার মনোহর ডাকাতের কালীমন্দির। শুনলেই যেন মনে হয় কোনো লোককথা! কিন্তু না, এটি বাস্তব। ব্রিটিশ শাসনের আমলে এক সাহসী ডাকাত ছিলেন মনোহর ডাকাত, যিনি ধনীদের কাছ থেকে লুঠ করা অর্থ দান করতেন গরিবদের। তাঁর নামেই আজও জীবন্ত এই কালীবাড়ি—যেখানে প্রতি বছর কালীপুজোয় ভিড় জমে হাজার হাজার ভক্তের।

একসময় দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চল ছিল গভীর জঙ্গলে ঢাকা। সেই নির্জন বনভূমির মাঝেই আশ্রয় নিয়েছিলেন মনোহর ডাকাত। জমিদার ও ইংরেজদের কাছে তিনি ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। তবে ডাকাতি তাঁর কাছে শুধুই সম্পদ লুঠের কাজ ছিল না—এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক রূপ। শোনা যায়, তিনি ডাকাতির আগে রক্ত দিয়ে চিঠি লিখে পাঠাতেন—“আটকাতে পারলে আটকাও”। এরপর সেই অর্থ তিনি বিলিয়ে দিতেন অসহায় মানুষের মধ্যে। একদিন সেই জঙ্গলেরই একটি কুয়ো থেকে তিনি খুঁজে পান এক কালীমূর্তি। সেই মূর্তির আরাধনাতেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়—এক ভয়ঙ্কর ডাকাত থেকে এক নিবেদিত কালীভক্তের যাত্রা।

মনোহর ডাকাতের কালীপুজো শুরু হয় সেই সময় থেকেই। কথিত আছে, ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মা কালীর পুজো করতেন তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুজোই হয়ে ওঠে দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্য। মন্দিরের সেবায়েত কল্লোল ভট্টাচার্য জানান, প্রায় দেড়শো থেকে দু’শো বছরের পুরোনো এই পুজো আজও একই ভক্তিভরে পালন করা হয়। কালীপুজোর দিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলে পূজা, অঞ্জলি ও ভোগের আয়োজন। ভক্তদের বিশ্বাস—এই মায়ের আশীর্বাদে দক্ষিণ কলকাতার এক বিশাল এলাকা শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে থাকে।

এই মন্দিরের রয়েছে আরও কিছু রহস্যময় দিক। একসময় এখানে নরবলির প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। তবে মনোহর ডাকাত কখনও নিরপরাধ মানুষকে বলি দিতেন না। বরং যাঁরা ব্রিটিশদের হয়ে দেশদ্রোহিতা করতেন, বিপ্লবীদের ধরিয়ে দিতেন—তাঁদেরই বলি দেওয়া হতো। সেই বলির পর দেহ ফেলা হতো মন্দিরের পাশের কুয়োয়। এখন অবশ্য সেই রীতির পরিবর্তে প্রতীকীভাবে চালকুমড়ো ও শসা বলি দেওয়া হয়। মন্দিরের আরেক বিস্ময়কর দিক হলো একটি গোপন কুঠুরি, যেখানে মনোহর নিজে আশ্রয় নিতেন ইংরেজদের চোখ ফাঁকি দিতে। বলা হয়, তাঁকে ধরতে ব্রিটিশ সরকার ইংল্যান্ড থেকে বিশেষ দল পাঠালেও তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিলেন—কারণ মনোহর ছিলেন অধরা, যেমন তাঁর নাম, তেমনই তাঁর কীর্তি।

আরও পড়ুনঃ Viral video: “এ যেন WWE ম্যাচ!” — দুই যুবকের মেট্রোয় মারপিটে তোলপাড় দিল্লি, ভাইরাল ভিডিওতে বিস্ফোরিত নেটদুনিয়া!

আজও সেই কালীমন্দিরে ঢুকলে মনে হয়, ইতিহাস যেন এখনো বেঁচে আছে। মোমবাতির আলো, ঘণ্টার ধ্বনি আর ধূপের গন্ধে ভরে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই মন্দির শুধু একটি উপাসনালয় নয়—এটি দক্ষিণ কলকাতার রক্ষাকবচ। মনোহর ডাকাতের কালীপুজো তাই শুধুই এক পুরনো কিংবদন্তি নয়, এটি আজও জীবন্ত এক বিশ্বাস, ভক্তি ও মুক্তির প্রতীক—যেখানে ভয়, ন্যায় ও ভক্তি একাকার হয়ে আছে মা কালীর পাদপদ্মে। মনোহর ডাকাত, কালীপুজো, দক্ষিণ কলকাতা, কলকাতার মন্দির, বাংলার ইতিহাস, কলকাতার ঐতিহ্য, কালীমন্দির, মনোহর ডাকাতের গল্প, কলকাতার রহস্য, ব্রিটিশ আমল, কালীভক্ত, পুজোর ইতিহাস, বিশ্বাস ও ভক্তি, বাংলার কিংবদন্তি, ঐতিহ্যবাহী পুজো, কলকাতার ধর্মীয় স্থান,

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

RELATED Articles