রাজধানীতে নিম্নমুখী সংক্রমনের গ্রাফ! চরম সংকটে সফল নেতৃত্ব দিচ্ছেন কেন্দ্রের চাণক্য অমিত শাহ!

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন জুলাইয়ের শেষাশেষি দিল্লিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছোঁবে সাড়ে ৫ লক্ষ। রাজধানীর বুকে করোনা রোখবার দায়িত্ব যাঁর উপরে ছিল, দিল্লির সেই উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসৌদিয়া নিজেই এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন ৯ জুন। তাঁর উল্লেখ করা সেই সময়সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য ছবি দেখা যাচ্ছে দিল্লিতে। আশঙ্কা যা করা হয়েছিল, মোটামুটি তার ২০ শতাংশেই আটকে রাখা গিয়েছে আক্রান্তের সংখ্যা। গত তিন সপ্তাহ ধরে প্রায় রোজই কমছে আক্রান্তের সংখ্যা। এবং এর সর্বময় কৃতিত্বের দাবিদার দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই। এমনটাই জানাচ্ছে দিল্লি। চরম রণকৌশলী তাঁর সুনাম দেশে বহু দিন ধরেই। দক্ষ রণকৌশলী হিসেবে নিজেকে অনেক বার প্রমাণও করেছেন তিনি রাজনীতির ময়দানে। আর তাইতো তার ওপর চোখ বুঁজে বিশ্বাস করেন প্রধানমন্ত্রী। দিল্লির কোভিড মোকাবিলা অভিযানের রাশ হাতে নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই ফের তা প্রমাণ করলেন অমিত। রাজধানীতে যে রকম বেলাগাম হয়ে পড়ছিল সংক্রমণের গতি, তাতে কিন্তু বাঁধ দেওয়া গিয়েছে। পরিসংখ্যান অন্তত সে কথাই বলছে। সমন্বয়,পরিকাঠামো বৃদ্ধি এবং অনর্গল নজরদারিতেই এই সাফল্য, বলছেন দিল্লিতে কোভিড মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত আধিকারিক এবং স্বেচ্ছাসেবীরা।

অরবিন্দ কেজরীবাল-মণীশ সিসৌদিয়ার সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক কতটা ‘মধুর’, তা সুবিদিত। ফলে উপরাজ্যপাল পদে যে-ই থাকুন না কেন, গত কয়েক বছর ধরে তাঁর সঙ্গে দিল্লির সরকারে মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসছে প্রায় পদে পদে। কোভিড মোকাবিলার প্রশ্নেও সেই বিরোধ দূরে সরিয়ে রাখা যায়নি। কেজরীবালের উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসৌদিয়া সিদ্ধান্ত নেয়, দিল্লিতে শুধু দিল্লিবাসীদেরই চিকিৎসা হবে, বাইরের কোনও বাসিন্দার চিকিৎসা দিল্লিতে হবে না। কেজরী সরকারের এই সিদ্ধান্তে বাধ সাধেন উপরাজ্যপাল অনিল বৈজল। সঙ্ঘাত তুঙ্গে পৌঁছয়। ফলে কেজরীবালের সরকারের তরফ থেকে দিল্লিতে করোনা মোকাবিলার দায়িত্বে থাকা সিসৌদিয়া হাত তুলে নেন। করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলা থেকে দিল্লি সরকার নিজেকে প্রায় পুরোপুরি সরিয়ে নেয়। সঙ্কট যখন এই রকম জটিল, তখনই আসরে নামানো হয় অমিত শাহকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশেই শাহ এই দায়িত্ব নেন। আর শাহ দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক এক মাস পরে দিল্লির করোনা পরিস্থিতির ছবি কিন্তু সত্যিই অন্য রকম। ৯ই জুন মণীশ সিসৌদিয়ার চোখের সামনে লেখচিত্রের রেখা যে রকম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ধরা দিয়েছিল, জুলাইয়ের মাঝখানে পৌঁছে কিন্তু আর সে রকম নয় ছবিটা। সংক্রমণের লেখ ক্রমশ নিম্নগামী।

১৬ জুলাইয়ের হিসেব বলছে, দিল্লিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৯৯৩। অর্থাৎ বড় অঘটন না ঘটলে সিসৌদিয়ার ভবিষ্যদ্বাণীর ধারেকাছেও পৌঁছবে না জুলাই শেষের ছবিটা। কিন্তু এর কৃতিত্ব অমিত শাহের কেন? কিভাবে নামলো সংক্রমনের গ্রাফ? প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পরেই দিল্লি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের জন্য দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা শুরু করে টিম অমিত।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের ব্যাখ্যা, সমন্বয় তৈরির কাজটা সর্বাগ্রে করেছেন শাহ। প্রথমে কেন্দ্রীয় সরকার, দিল্লি সরকার এবং দিল্লির নগর নিগমের মধ্যে। তার পরে বিভিন্ন দলের সঙ্গে বৈঠক করে রাজনৈতিক স্তরে। সমন্বয়টা সেরেই নীতি আয়োগের কর্তা, এমসের ডিরেক্টর, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে হাই-প্রোফাইল ‘টিম’ তৈরি করে ফেলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেই টিমের উপরে দায়িত্ব বর্তায় দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার রণকৌশল তৈরি করে ফেলার। তার জন্য কেন্দ্র, রাজ্য, পুরসভা বা যে কোনও সরকারি সংস্থার তরফ থেকে যে রকম সাহায্য লাগবে, সব মিলবে— আশ্বাস দেন শাহ। এই কাজটা করা কিন্তু কেজরী বা সিসৌদিয়ার পক্ষে কঠিন ছিল। অমিত শাহ যে পদে রয়েছেন, সেখান থেকে এই ধরনের সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব, কারণ গোটাটাই তাঁর এক্তিয়ারের মধ্যে। দিল্লির মতো একটি রাজ্যের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বা উপমুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে সেটা সম্ভব নয় সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণেই।

দায়িত্ব নিয়েই শুরুতেই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের জন্য দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা শুরু করে ‘টিম অমিত শাহ’। তার পরে শুরু হয় দ্রুত পরিকাঠামো বাড়ানো। রেল মন্ত্রক, স্বাস্থ্য মন্ত্রক, আধাসেনা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে জুড়ে নেওয়া হয় দিল্লির কোভিড মোকাবিলা নেটওয়ার্কে। এরপরই বদলাতে থাকে দিল্লিতে করোনা সংক্রমনের ছবিটা।

১ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত আড়াই মাসে প্রতি দিন গড়ে ২ হাজার ৮০০ জনের কোভিড পরীক্ষা হচ্ছিল দিল্লিতে। ১৫ জুন থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত সেই গড় ১৭ হাজার। ৮ জুলাইয়ের পরে সেই গড় বেড়ে ২০ হাজারে পৌঁছে গিয়েছে বলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে জানা যাচ্ছে। ১৪ জুন পর্যন্ত দিল্লিতে কোভিড চিকিৎসার জন্য শয্যা ছিল ৯ হাজার ৯৩৭টি। এখন তা পৌঁছে গিয়েছে ৩০ হাজারে। এর মধ্যে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং আধাসেনাই ১৯ হাজার শয্যার দেখভাল করছে।

শুধু চিকিৎসা পরিকাঠামো তৈরি করা অবশ্য যথেষ্ট ছিল না দিল্লির জন্য। চিকিৎসার আকাশছোঁয়া খরচ কমানোটাও জরুরি ছিল বলে দিল্লিবাসীদের অনেকেরই মত। কারণ শুরুর দিকে দিল্লিতে আইসোলেশন বেডের ভাড়া ছিল ২৪-২৫ হাজার টাকা। ১৪ জুনের পর থেকে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮-১০ হাজার টাকায়। আগে ভেন্টিলেটরহীন আইসিইউ বেডের জন্য রোজ গুণতে হচ্ছিল ৩৪ হাজার থেকে ৪৩ হাজার পর্যন্ত। এখন তা ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজারেই মিলছে। ভেন্টিলেটর-সহ আইসিইউ-এর খরচ ছিল ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজার টাকা। এখন তা মিলছে ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজারে। পিপিই কিট এবং ওষুধের দাম ধরেই কিন্তু এই খরচ। ১৪ জুনের আগে পর্যন্ত পিপিই কিট এবং ওষুধের দাম আলাদা দিতে হচ্ছিল।

দিল্লির সরকার যে হোম আইসোলেশন নীতি নিয়েছিল, তা-ও বদলে ফেলা হয় অমিত শাহ দায়িত্ব নেওয়ার পরেই। উপসর্গ বা অসুস্থতা গুরুতর না হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার নেই, বাড়িতেই আইসোলেশনে থাকুন— পরামর্শ ছিল সিসৌদিয়াদের। কিন্তু এই আইসোলেশনে কী করণীয় এবং কী করা উচিত নয়, সে সব খুব স্পষ্ট করা। হয়নি তখন। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছিল। আক্রান্তদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিপন্ন হয়ে পড়ছিলেন। শাহের টিম সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি তৈরি করে দেয়। হোম আইসোলেশনে যাঁরা থাকছেন, তাঁদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা এবং প্রয়োজন পড়লেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্তও তৈরি রাখা হয়। অসুস্থ বা কোয়রান্টিনে থাকাকালীন বাড়ি থেকে বেরনোর প্রয়োজনই যাতে কারও না হয়, তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিকে কাজে লাগানো হয়।

RELATED Articles

Leave a Comment