নদিয়ার মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কয়েক সপ্তাহ ধরেই উত্তাপ বাড়ছে। নাগরিকত্ব নিয়ে দোলাচলে পড়েছেন বহু মানুষ, যারা কয়েক দশক ধরেই নিজের জায়গায় স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। একদিকে কেন্দ্রের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে বাস্তবতার টানাপড়েন—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মতুয়া পরিবারের মধ্যেই। স্থানীয়দের দাবি, এতদিন ধরে ধর্ম রক্ষার কারণে সীমান্ত পেরিয়ে আসা মানুষদের এখনও চূড়ান্ত স্বীকৃতি না মিললে তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। সেই আশঙ্কাই নতুন করে আলোচনায় আনল বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকারের সাম্প্রতিক মন্তব্য।
রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ স্পষ্ট জানিয়েছেন—২০১৪ সাল নয়, ২০২৪ পর্যন্ত এবং এখনও পর্যন্ত যাঁরা বাংলাদেশ থেকে অত্যাচার সহ্য করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককেই নাগরিকত্ব দিতে হবে। তাঁর বক্তব্য, “ধর্ম রক্ষার্থে যারা এসেছে, তাদের অধিকার নিশ্চিত করতেই হবে।” এই দাবি নিয়ে আগামী শীতকালীন অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করবেন তিনি। শুধু আবেদন নয়, প্রয়োজনে মতুয়াদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে নামতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন সাংসদ। নদিয়ার বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নেতৃত্বে সম্প্রতি মিছিলও হয়েছে।
এরই মধ্যে ঠাকুরবাড়ি ও দিল্লিতেও CAA কার্যকর নিয়ে সরব হয়েছেন তৃণমূল সাংসদ মতুয়াবালা ঠাকুর। আন্দোলনের আঁচ ছড়িয়েছে রানাঘাটেও, যেখানে মতুয়া ভোটার সংখ্যাই বেশি। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে কেন্দ্র গঠনের পর তৃণমূল দু’বার জিতলেও ২০১৯-এ বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ে কেন্দ্রটি। সেই সময়ই মুকুটমণি অধিকারীকে হারিয়ে জয়ী হন জগন্নাথ সরকার। তাই এই কেন্দ্রের মানুষের চাহিদা পূরণে তাঁর ওপর চাপও অনেক বেশি—যা তিনি এড়িয়ে যেতে চাইছেন না বলেই স্পষ্ট।
একইসঙ্গে উঠে এসেছে আরেকটি বড় বিতর্ক। জগন্নাথ সরকারের অভিযোগ, সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনেকেই কষ্ট করে ভোটার লিস্টে নাম তুলতে পেরেছেন, কেউ পারেননি। তাঁদের সবাই এই দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য। যদি ভারত সরকার নাগরিকত্ব না দেয়, তবে তাঁদের জন্য বাংলাদেশেই স্বতন্ত্র হোমল্যান্ড তৈরি করতে হবে—এই দাবি তুলে আরও তীব্র রাজনৈতিক বার্তা দিলেন সাংসদ। তাঁর কথায়, “সমস্ত উদ্বাস্তু মানুষকে CAA-র আওতায় আনতেই হবে।” অন্যদিকে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর ও সুব্রত ঠাকুরও ইতিমধ্যেই আশ্বস্ত করেছেন যে CAA কার্যকর হবে—যা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
আরও পড়ুনঃ ভোটার তালিকা নিয়ে আতঙ্কে মতুয়ারা! শিয়ালদহ থেকে কমিশন দফতর পর্যন্ত তৃণমূল-সমর্থিত মিছিল, ‘একই বৃন্তে তিন ফুল’ বলেই খোঁচা শান্তনুর
তবে পরিস্থিতি সহজ নয়। নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নিজের বা বাবা-মায়ের নাম না থাকলে নাগরিকত্ব প্রমাণে কমিশনের নির্দিষ্ট নথি দিতেই হবে। তা না হলে ভোটার তালিকায় নাম উঠবে না। এই নিয়মেই অস্বস্তি বেড়েছে মতুয়াদের। তাঁদের দাবিতে সমর্থন জানিয়েছে কংগ্রেসও। অধীররঞ্জন চৌধুরী সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে অর্ডিন্যান্স জারির দাবি তুলেছেন। সব মিলিয়ে, জগন্নাথ সরকারের নতুন বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং আগামী দিনে মতুয়া রাজনীতির মোড় ঘোরানোর সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।





