মানুষের নৃশংসতার কোনো ক্ষমা হয় না। হওয়া উচিতও না। একদিকে মারণ করোনা ভাইরাসের হাতে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হচ্ছে মানব জাতি তার মধ্যেও কি তাদের চরিত্রের একটুও পরিবর্তন হবে না?
অনেকেই বলে, ‘হাতি পোষ্য হলে সে মানুষের জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারে!’ বাস্তবেও তার অনেক প্রমাণও আছে। কিন্তু মানুষ? বারংবার? এমনকি নিজেরা করোনার মুখে দাঁড়িয়েও প্রাণ নিতে পিছপা হয় না। কখনো মজার ছলে আবার কখনো প্রতিহিংসায়, নির্বাক প্রাণীর প্রাণ কেড়ে নিতে মানুষ যেন নিজেকে ভগবানের সমকক্ষ জ্ঞান করে ফেলে। কেরালার বুকে এক গর্ভবতী হাতিকে এমনই নৃশংসভাবে খুন করল কিছু মানুষ। তবুও সেই মা হাতি কাউকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করে হাসতে হাসতে জলসমাধি নিয়ে নিল।
খুন নয় তরপে তরপে মারল এক হাতিকে ওরা। হাতিটার অপরাধ কি ছিল? মানুষকে বিশ্বাস করা। ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর কেরালার মালাপ্পুরম জেলায়। বনকর্মীরা জানিয়েছেন, হাতিটি বন থেকে লোকালয়ে চলে এলেও সে মানুষকে অত্যন্ত বিশ্বাস করত। বনে খাদ্যাভাবের জন্যই সে লোকালয়ের দিকে চলে আসে। আর সেই সময়ই তাকে বাজি ভরতি আনারস খেতে দেওয়া হয়। এরপর নিজের আর পেটের সন্তানের স্বার্থেই আনারসটি খেয়ে নেয় সে। খাওয়ার পরই আচমকা বিস্ফোরণ। বাজি ভরা আনারস ফাটতেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় হাতিটির জিভ এবং মুখ। এরপরও গর্ভের সন্তানকে বাঁচানোর তাগিদে লোকালয়ে ছুটে বেড়িয়েছে সে। তবু কোনো বাড়ির বা মানুষের ক্ষতি করেনি সে। অসহ্য যন্ত্রণা কাতর এক মা খিদে নিয়ে সারা গ্রাম হেঁটে বেড়ায়। এই অবস্থায় সে একটু জল খুঁজছিল। তাতে যদি পেটের সন্তানটাকে বাঁচাতে পারে।
এরপর নিজের চেষ্টাতেই সেই হাতি পৌঁছে যায় ভেলিয়ার নদীর জলে। জলের খোঁজ পেয়েই সে চুপচাপ গিয়ে দাঁড়ায় নদীর মাঝে। তখনও হয়তো সে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল যদি তার সন্তান একটু পৃথিবীর মুখ দেখতে পায়। কিন্তু বৃথা হল সব চেষ্টাই। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল সে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হাতিটি নদীর জলে শুঁড় এবং মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ। যদি মুখ ফেটে যাওয়ার অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে কিছুটা রেহাই মেলে।
বনবিভাগের আধিকারিক মোহন কৃষ্ণন লিখেছেন, ‘মানুষকে বিশ্বাস করাটাই ওর কাল ডেকে আনল। মানুষের ওপর বিশ্বাস করে সে ভালো খাবার ভেবে খেয়ে নেয় আনারস। হয়তো সে ভাবছিল নিজের আসন্ন সন্তানের কথাও। প্রচন্ড যন্ত্রণা আর কষ্টেও হাতিটি কারও কোনোও ক্ষতি করেনি। কারোর প্রতি কোনো প্রতিশোধও নেয়নি সে। আসলে ওর কাছে ভালো করা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।’
কৃষ্ণন জানিয়েছেন, ‘অন্য দুটি কুনকি হাতি দিয়ে নদী থেকে এই হাতিটিকে তোলার অনেক চেষ্টা করা হলেও সে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। আমার মনে হয় ও নিজের মৃত্যুকে দেখতে পেয়েছিল। তাই আমাদের কিছু করতে দেয়নি।’ নদীতে দাঁড়িয়েই সে জলসমাধি নেয়।
মৃত্যুর পর তার নিথর দেহটিকে ট্রাকে করে জঙ্গলে নিয়ে যান বনবিভাগের কর্মীরা। সেখানেই তাঁকে দাহ করা হয়। কৃষ্ণন বলেন, ‘ডাক্তার ময়নাতদন্ত করে জানিয়েছেন, খুব তাড়াতাড়ি সে এক সন্তানের জন্ম দিত। মরার সময় ওর কষ্টের কথা ভাবাও যায়না। তাই শেষবার মাথা নত করে ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম আমরা।’
করোনার জেরে গৃহবন্দী মানুষ। আর সেই সুযোগেই প্রকৃতি আবার নিজেকে একটু সুন্দর করার সুযোগ পেয়েছে। শহর-গঞ্জের পথেঘাটে বিচরণ করতে দেখা গেছে বন্য প্রাণীদের। কখনও গুরুগ্রামের রাস্তায় হেঁটেছে হরিণ আবার কখনও ব্যারাকপুরের রাস্তায় ময়ূর। সব দেখে অনেকেই বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির ওপর এতদিন যথেচ্ছাচার চালিয়েছে মানুষ। আজ তারই ফল ভোগ করছে। মানুষ আজ ঘরে, আর পশুপাখিরা রাস্তায়।’ কিন্তু এই করোনার মধ্যেও মানুষের এইরূপ আচরণ? মানুষের কি মৃত্যু ভয়ও ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে? কেরালার নৃশংস হাতি-হত্যার ঘটনা কি মানবতার ধ্বংসের ইঙ্গিত নয়?





