তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে নিশ্চয় এমন কোনও অঙ্ক কষতে দিতেন, যার সমাধান সূত্র বের করতে গিয়ে হয়ত নাকানিচোবানি খেতে হত তাবড় তাবড় গণিতজ্ঞদের। সেই প্রবাদপ্রতিম মাস্টারমশাই কেশব চন্দ্র নাগকে তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিয়েছেন তাঁর অনুগামীরা।
তাঁর পুরো নাম কেশব চন্দ্র নাগ হলেও তিনি কে সি নাগ নামেই বেশি পরিচিত। বিশেষ করে বাংলা মিডিয়ামের পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণীর পড়ুয়াদের কাছে। অঙ্কের বইয়ের খুললেই যে তাঁর নামটাই সর্বপ্রথম চোখে পড়ে। তাঁর জটিল অঙ্কের সমাধান করতে করতে যে কতশত পড়ুয়াই তাঁকে ‘গালমন্দ’ করেছে, তার হয়ত ইয়ত্তা নেই। তবুও এটা তো মানতেই হবে, তাঁর সেই কঠিন অঙ্কের সমস্যার জন্যই হয়ত পড়ুয়ারা আজ ভালো কোনও জায়গায় প্রতিষ্ঠিত।
কে সি নাগের সেই পিতা পুত্রের বয়সের সমাধান করাই হোক বা তেল লাগানো বাঁশে হনুমানের পিছলে পড়া বা চৌবাচ্চার নলের ফুটো দিয়ে একদিক থেকে জল ঢোকানো আর অন্যদিক দিয়ে জল বের করা, এসমস্ত অঙ্ক কষতে কষতেই কিন্তু বড় হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কিন্তু কেশব চন্দ্র নাগ কীভাবে হয়ে উঠলেন কে সি নাগ। অঙ্কের বইয়ের পাতায় নাম নামই বা প্রজ্বলিত হল কীভাবে, সেকথা হয়ত অনেকেরই জানা নেই। সেদিকে আজ একটু আলোকপাত করা যাক!
দিনটা ছিল রথযাত্রা। ১৮৯৩ সালের ১০ জুলাই হুগলির গুড়াপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই অসামান্য গণিতজ্ঞ কেশব চন্দ্র নাগ। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। গুড়াপের গ্রামের স্কুল থেকেই শুরু প্রাথমিক শিক্ষা। ১৯১৪ সালে আইএসসি পরীক্ষাতে ‘ফার্স্ট ডিভিশন’ নিয়ে পাশ করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন রিপন কলেজ (বর্তমান নাম সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) বিজ্ঞান বিভাগে। সেই সময়ই ‘থার্ড মাস্টার’ হিসেবে কাজ শুরু করেন ভাসতারা যোগেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে।
গণিত ও সংস্কৃত নিয়ে স্নাতক পাশ করেছিলেন কেশব চন্দ্র নাগ। এরপর কিষাণগঞ্জ হাইস্কুলে গণিতের শিক্ষক হন তিনি। পরে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে যোগ দেন গণিতের শিক্ষক হিসেবেই। ১৯০৫ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ভবানীপুরে মিত্র ইনস্টিটিউশনের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর ঠিক পরের বছরই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হয়েছিলেন। সেই সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারতের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় করতে চেয়েছিলেন তিনি।
নানান সূত্রের মাধ্যমেই কেশব চন্দ্র নাগের নাম কানে আসে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের। সেই সময় তিনি নিজের থেকেই কেশব চন্দ্র নাগকে প্রস্তাব দেন মিত্র ইনস্টিটিউশনে যোগ দেওয়ার জন্য। এরপর এই স্কুলের গণিত শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন কে সি নাগ।
এরপরই শুরু হয় তাঁর গণিতের লেখক হিসেবে জয়যাত্রা। লেখার বিষয়ে তিনি সাহায্য পেয়েছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে প্রেমেন্দ্র মিত্র, কালিদাস রায় ও আরও অন্যান্য লেখকদের। অবশেষে কেশব চন্দ্র নাগের লেখা বই প্রকাশিত হয় ‘নব পাটিগণিত’ নামে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে তাঁর এই বই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এখানেই থেমে থাকেন নি তিনি। এরপর ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘ম্যাট্রিক ম্যাথেমেটিক্স’ বই যা বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলিতে রীতিমতো হল্লা ফেলে দেয়। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও পড়ুয়াদের কাছে তাঁর লেখা গণিতের বই যেন হয়ে ওঠে এক সম্পদ। চতুর্থ শ্রেণী টেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণীর পড়ুয়াদের জন্য প্রায় ৪২টি গণিতের বই লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা বইগুলি বাংলা তো বটেই ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, নেপালি ভাষাতেও প্রকাশিত হয়েছে।
শুধুমাত্র গণিতের বই-ই নয়, ১৯২৫ থেকে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তাঁর রত্না বেদি নামের ডায়েরিতে তিনি একাধিক কবিতা, গানও লিখেছিলেন। শুধুমাত্র গণিতজ্ঞই নন, তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীও ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনে’ অংশ নিয়ে জেলও খেটেছেন কেশব চন্দ্র নাগ। ফুটবল ও ক্রিকেটেরও এক গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন এই কে সি নাগ। মোহনবাগান ক্লাবের সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি।
তাঁর ক্রিকেটপ্রেমের জন্যই সেরিব্রাল অ্যাটাক হয় তাঁর। ১৯৮৫ সালে যখন ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যে টেস্ট ম্যাচ চলছিল, সেই সময় সেই ম্যাচের উত্তেজনার মধ্যেই সেরিব্রাল অ্যাটাক হয় কেশব চন্দ্র নাগের। এরপর দু’বছর বেঁচেছিলেন তিনি। ১৯৮৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন বিশিষ্ট এই গণিতজ্ঞ ও প্রবাদপ্রতিম মাস্টারমশাই কেশব চন্দ্র নাগ।
তিনি হয়ত আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁর কীর্তি, তাঁর সৃষ্টি আজও রয়ে গিয়েছে সেই পঞ্চম শ্রেণী থেকে শুরু করে দশম শ্রেণীর অঙ্কের বইগুলোতে। বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেটে যাবে, কিন্তু তাও কে সি নাগের নাম বারবার উচ্চারিত হতে থাকবে এই অঙ্কের বইগুলোর পাতায়। আর এভাবেই শারীরিকভাবে না থেকেও কে সি নাগ বা কেশব চন্দ্র নাগ আজীবন থেকে যাবেন শিক্ষকমহল ও পড়ুয়াদের মনের মণিকোঠায়।





