দেখে মনে হবে মস্ত ইটের গম্বুজ। শুধু পড়ে রয়েছে ইট। চুন সুড়কির কোন প্রলেপই আর স্পষ্ট নয়। বাড়ির গায়ে গজিয়ে উঠেছে অশ্বথ, বুনোগাছ। চারদিকে আগাছা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন পোড়ো বাড়ি। বাড়ির দেওয়ালে শত প্রাচীন টেরাকোটার কাজ এখনও স্পষ্ট। এ বাড়ি সাধারণ কোন বাড়ি নয়। এ বাড়ি ৪০০ বছর পুরনো জমিদার বাড়ি। লোকমুখে শিবকুঠির নামে পরিচিত। তবে কেন এই নাম তা জানা যায়নি। ভগ্ন প্রায় দশায় এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে বালির শিবকুঠির। অনেক কাল আগেই ঐতিহ্য হারিয়েছে এই শিবকুঠির। হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাস।
এককালে হুগলির গোঘাটের বালি এলাকায় বাস ছিল মিশ্র পরিবারের। শোনা যায়, ইংরেজদের সময়ে জমিদারী ছিল এই মিশ্র পরিবাবের। জমিদার ছিলেন শিব মিশ্র ও তার ভাই শংকর মিশ্র। সেসব ইংরেজ আমলের কথা। সেসময় ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন জমিদার। অত্যাচার চলত নির্মম চাষিদের ওপর। নীল চাষে নিযুক্ত চাষিদের এই কুঠির থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন অত্যচারী জমিদার শিব মিশ্র। ইতিহাস ঘেঁটে জানা গিয়েছে, কালে জমিদারদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতেন ইংরেজরা। অন্যথা হয়নি। পরবর্তী সময়ে শিববাবুকে এই দায়িত্ব দিয়ে এলাকা ছেড়ে ইংরেজরা।
শোনা যায় তারপর থেকে অত্যাচার আরও নির্মম হতে থাকে। বাড়ে অত্যাচারের মাত্রাও। সাধারণ মানুষদের শোষণের সাক্ষী এই বাড়ি। বাড়ি দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যাবে চাষিদের হাহাকার। খুব একটা ভালো মানুষ ছিলেন না শিববাবু। তার আঙ্গুলের ডগায় না চললে শাস্তি ছিল বিরাট। গোটা এলাকাকে নিজের বশে রাখতেন জমিদার শিববাবু। এই শিবকুঠিরের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে অত্যাচারের কাহিনী।
ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম থাকলেও আর খোঁজ মেলেনি তাদের। সভ্যতার সাথে হারিয়ে গেছে জমিদারি প্রথা। মিশে গেছে সেই শিবকুঠিরের আনাচে-কানাচে। হঠাৎ এ বিলুপ্ত হয়নি ক্রমশ শেষ হয়ে গিয়েছে। সমাজ পরিবর্তন হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে এলাকা। জমিদারি প্রথা উঠে গেছে বহুদিন। শিববাবুর বংশধরদের আর তেমন করে কেউ কখনও দেখেনি।
সভ্যতার সাথে একদিন হারিয়ে যায় ওই অত্যাচারী জমিদার পরিবার। বর্তমান প্রজন্মের কেউ বেঁচে রয়েছেন কিনা তা কেউই জানেন না। জানেন না এলাকার পুরোনো বাসিন্দারাও। মানুষ চলে গিয়েছে আর কেউ বসবাস করে না। বিভিন্ন বিপর্যয়ের সাথে একাই লড়েছেন শিবকুঠির। আর কেউই ফিরে তাকায় না। নেই সেই কঠিনের জৌলুস। স্থানীয়রা দাবী করেছেন, এই কুঠিরে স্থাপত্য বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য। সংস্কার না করার ফলে নষ্ট হচ্ছে এই বাড়ি। হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস। সংস্কার করবেই বা কে? তাদের পরিবারের কাউকেই আর স্থানীয়রা চেনেন না। অত্যাচারের গল্প নিয়েও শিবকুঠিকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় সেখানকার স্থানীয় মানুষেরা।
গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, “প্রায় ৪০০ বছর আগে এই কুঠি তৈরি হয়। এই জমিদারদের নীল চাষ ছিল। এছাড়াও বিভিন্ন ব্য়বসা ছিল ওদের। সেই টাকা দিয়ে বানায় এই বাড়ি। তার পর একদিন ওরা রাতারাতি এখান থেকে চলে যায়। ওদের বংশ আছে কী না জানা নেই।”





