আমাদের দেশে প্রত্যেকটি রাজ্যসরকার তাদের প্রশাসনিক কাজগুলি সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন স্তরে অফিসার ও কর্মচারী নিয়োগ করেন লোকসেবা আয়োগ (Public Service Commission)-এর মাধ্যমে। এই অফিসার ও কর্মচারীরাই একটি রাজ্যের নিয়ম নীতি তৈরি করেন, রাজ্যের বিভিন্ন সমস্যায় সমাধান খুঁজতে এগিয়ে যান। কিন্তু আমাদের রাজ্যে বাংলা ভাষার পেপার বাধ্যতামূলক না হওয়ায় বাইরের ছেলেমেয়েরা হিন্দি-উর্দুতে পরীক্ষা দিয়ে রাজ্য সরকারি বড় বড় চাকরি দখল করছে দিনের পর দিন। এদিকে গুজরাত রাজ্যে ১৫০ নম্বরের গুজরাতি পেপার, মহারাষ্ট্রে ১০০ নম্বরের মারাঠি পেপার, কর্ণাটকে ১৫০ নম্বরের কন্নড় পেপার, এমনকি বিহারেও ১০০ নম্বরের হিন্দি পেপার বাধ্যতামূলক। তাই পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক না হওয়ার ফলে অনেক অবাঙালীরাই পশ্চিমবঙ্গের শাসনতন্ত্রের অংশ হয়ে যাচ্ছেন কিন্তু বাংলার মানুষের কাছে ভাষার জন্য পৌঁছতে পারছেন না। এটা কি একটি রাজ্যের মানুষের ক্ষেত্রে খারাপ নয়? সেই নিয়ে এবার লোকসেবা আয়োগ-এর এই কাজে প্রশ্ন তুললো “বাংলা পক্ষ“।
UPSC-র মাধ্যমে IAS, IPS হওয়া এখন বাঙালি সহ অহিন্দি জাতিগুলোর কাছে একটা স্বপ্নের মতো। UPSC র প্রিলিমস-এ হিন্দি-ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য ভাষায় দেওয়ার সুযোগ নেই, অর্থাৎ এক্ষেত্রেও বাঙালি ছেলেমেয়েদের ইংরেজি ভাষাটাকে রপ্ত করেই পরীক্ষায় বসতে হয়, আর অন্যদিকে হিন্দিভাষীরা নিজেদের মাতৃভাষায় পরীক্ষা দেওয়ায় কিছুটা লাভবানই হন বটে।
বাংলা পক্ষের সহযোদ্ধা কৌশিক মাইতির দাবি, ‘এই হিন্দিভাষীরা উত্তর ভারতীয় হওয়ায় তারা বেশিরভাগই বাঙালি বিদ্বেষী, তারা বাংলা ও বাঙালির স্বার্থে কাজ না করার মানসিকতা নিয়েই আসে।’ আমাদের রাজ্যের নেতা মন্ত্রীরা এই বিষয়ে বিন্দু বিসর্গ চিন্তিত নন কারণ তাদের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা খুবই কম। এই বাংলা ভাষার অনুপস্থিতির দরুন এই বহিরাগত IAS-IPS-রা সহজেই বাঙালির ক্ষতি করে চলেছে বলে দাবি বাংলা পক্ষ-এর।
বাংলা পক্ষের সহযোদ্ধার আরও অভিযোগ যে, ‘আমাদের এলাকার বিডিও কি বিহার থেকে আসা কোনও বাঙালি বিদ্বেষী হবে? বাংলার কৃষকদের স্বার্থ দেখবে উত্তরপ্রদেশ থেকে এসে WBCS পাশ করা কোনও কৃষি আধিকারিক? বিডিও অফিস বা অন্যান্য সরকারি অফিসে গিয়ে হিন্দি-উর্দুতে কথা বলতে বাধ্য করা হবে বাঙালিকে? তারা বাঙালির কষ্ট আদৌ বুঝবে? বাংলার মাটি তারা চেনে?’
IAS-IPS সর্বভারতীয় পরীক্ষা তাই এটা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু রাজ্যস্তরের পরীক্ষাগুলো আমাদের রাজ্যের আওতায় পরে। তাহলে সেখানে কেন বাংলার ওপর জোর দেওয়া হয় না?
এটা পরিষেবার প্রশ্ন, রাজ্যের মানুষদের স্বার্থের প্রশ্ন। বাঙালি সহ কোনও ভূমিপুত্রকে বঞ্চিত করা চলবে না। বাংলা ভাষার ভিত্তিতে তৈরি রাজ্য, বাংলায় ৮৬% বাঙালি (২০১১ র আদমশুমারি অনুযায়ী), এ রাজ্যের মূল সরকারি ভাষা বাংলা।
কিন্তু এই বাংলার পিএসসি-র নানা পরীক্ষায় ইংরেজি ভাষা বাধ্যতামূলক কিন্তু বাংলা নয়। বরং বাংলা জানা না থাকলে তাঁর কাছে হিন্দি, উর্দু, সাঁওতালি ও নেপালির অপশন দেওয়া হয়, কিন্তু তাকে ইংরেজিটা ভালো ভাবে পড়তেই হয়। না হলে সে পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। ফলে বিহার বা ইউপি থেকে এসে যে কেউ বাংলায় WBCS অফিসার হয়ে বাঙালিকে শাসন করতে পারে।
বাংলা পক্ষের তরফে আমাদের গত বছরের ডব্লুবিসিএস পরীক্ষার পাশের তালিকাও দেখানো হয়, তাতে ষষ্ঠ হয়েছে বিহারের এক হিন্দিভাষী। তারা প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে তো যে কেউ এসে বাংলায় বড় চাকরি নিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বাঙালি কি অন্য রাজ্যের সরকারি চাকরি পায়? অন্য সব রাজ্যের সরকার রাজ্যের মানুষের স্বার্থ দেখে, তাই সেখানে তাদের সরকারি ভাষাটা বাধ্যতামূলক।’
তারা কিছু রাজ্যের সরকারি পরীক্ষার নিয়ম গুলি দেখান এবং সেখানে সব রাজ্যেই পিএসসি পরীক্ষায় সে রাজ্যের মূল সরকারি ভাষায় ১০০ বা ১৫০ নম্বরের বিষয় বাধ্যতামূলক রয়েছে। সহযোদ্ধা কৌশিকের আরও অভিযোগ, ‘যে রাজ্য থেকে বাংলায় এসে এরা চাকরি-কাজ-এলাকা-মাটি দখল করছে, সেই বিহারেই কিন্তু বাধ্যতামূলক হিন্দি পেপার আছে। শুধু তাই নয়, মহারাষ্ট্রে ১০০ নম্বরের মারাঠি, কর্ণাটকে ১৫০ নম্বরের কন্নড় পেপার বাধ্যতামূলক৷ অন্ধ্রপ্রদেশে তো আবার আইন করে ভূমিপুত্রদের জন্য সংরক্ষণ শুরু করেছে। পাশের রাজ্য ওড়িশা ও বাম শাসিত কেরালায় পিএসসির পরীক্ষায় বসতে গেলে যথাক্রমে ওড়িয়া ও মালায়ালম মাধ্যমে পড়াশোনা করতে হয় বা মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকে একটা বিষয় হিসাবে ওড়িয়া ও মালায়লম থাকতেই হবে।
এমনকি গুজরাতেও গুজরাতিরা পিএসসি মেইনস পরীক্ষায় ১৫০ নম্বরের গুজরাতি পেপার বাধ্যতামূলক করেছে। তাঁরা মুখে বলেন এগুলো সব প্রাদেশিকতা যার জন্য আমাদের মধ্যে বিভেদ হয় তাই সবার আগে আমাদের ভারতীয় হতে হবে। তারাও এক সপ্তাহে ৫০ হাজার বিহারীকে বিহারে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। বাংলা পক্ষ সাফ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ওরা আমাদের বোকা বানিয়ে নিজেদের স্বার্থ গুছিয়ে নিচ্ছে। আর আমরা নিজের অধিকার ভুলে সব কিছুকে ছেড়ে দিচ্ছি আর নিজেদের সুযোগ নষ্ট করছি।’
বাংলা পক্ষ এবার রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, ‘গত সত্তর বছর ধরে আমাদের রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে আমাদের রাজ্য সরকার, এটা লজ্জার। শাসক দল বদলেছে, কিন্তু বাংলার ভূমিপুত্রদের স্বার্থ কেউ দেখেনি। নেতা-মন্ত্রীরা যাদের ভোটে নির্বাচিত, তাদের কথাই ভাবে না, সে চেতনাই নেই। অন্যান্য সব রাজ্যে এক নিয়ম, কিন্তু বাংলায় আলাদা। সব রাজ্যে এক নিয়ম চলে, বাংলার ক্ষেত্রে তা আলাদা কেন? বাংলা কি ধর্মশালা? বাংলা কি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র?’
নিজের মাটিতে থেকে বাঙালি বঞ্চিত হচ্ছে দিনের পর দিন। তাই লক্ষ লক্ষ বাঙালি পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের স্বার্থে, রাজ্যে সরকারি পরিসেবার স্বার্থে, বাংলায় পিএসসির সব পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের বাংলা/সাঁওতালি পেপার বাধ্যতামূলক করার দাবি জানাচ্ছে বাংলা পক্ষ।
রাজ্য সরকার বাংলার মানুষের স্বার্থে, এবং রাজ্যের স্বার্থে পিএসসির সব পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের বাংলা পেপার বাধ্যতামূলক করুক নাহলে বাঙালিরা তাদের রাজ্যেই ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবে না।





