রাজ্যে সরকার বদলের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক প্রকল্পগুলিকে ঘিরে। বিশেষ করে যুবসাথী ও অন্নপূর্ণা প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে কৌতূহল এবং উদ্বেগ দুটোই। নতুন বিজেপি সরকার প্রথম থেকেই জানিয়ে দিয়েছে, আগের সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না। তবে প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা এবং তথ্য যাচাইয়ের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। সেই কারণেই এবার যুবসাথী প্রকল্পের প্রায় ৫৫ লক্ষ উপভোক্তার তথ্য ফের যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে অন্নপূর্ণা প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তিও জারি হয়েছে, যেখানে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন আর কারা পাবেন না।
ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তী বাজেটে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাধ্যমিক পাশ বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য যুবসাথী প্রকল্প চালু করেছিলেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি মাসে দেড় হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে সরকার বদলের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, প্রকল্প বন্ধ করা হবে না, বরং বেকার ভাতা বাড়িয়ে তিন হাজার টাকা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনই সেই টাকা মিলছে না। কারণ প্রশাসনের দাবি, খুব অল্প সময়ের মধ্যে আবেদন গ্রহণ ও টাকা পাঠানোর কারণে অনেক তথ্য ঠিকমতো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে এসেছে। একই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে দু’বার টাকা ঢুকেছে কি না, ভুয়ো তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই কারণেই আপাতত যুবসাথীর টাকা বন্ধ রাখা হয়েছে। পুনর্যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে টাকা দেওয়া হবে না বলেই প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে প্রায় এক লক্ষ উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে প্রায় ৫৫ লক্ষ যুবক-যুবতীর অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যায়। মার্চ ও এপ্রিল মাসের টাকা দেওয়া হলেও মে মাসে আর সেই টাকা মেলেনি। সাধারণত প্রতি মাসের ১০ তারিখে এই ভাতা দেওয়া হত। কিন্তু ভোটের ফলের পর সরকার বদলের কারণে পুরো প্রক্রিয়াই থমকে যায়। প্রশাসনের একাংশের মতে, ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হয়েছিল অনলাইন এবং অফলাইন দুই মাধ্যমেই। এত কম সময়ের মধ্যে আবেদন যাচাই করে টাকা পাঠানোয় স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে ইতিমধ্যেই শিবিরে জমা পড়া আবেদনপত্র ডিজিটাইজ করা হয়েছে। ফলে নতুন করে তথ্য যাচাই করতে খুব বেশি সমস্যা হবে না বলেই মনে করছে প্রশাসন।
অন্যদিকে, অন্নপূর্ণা প্রকল্প নিয়েও বড় ঘোষণা করেছে নতুন সরকার। জুন মাসের শুরু থেকেই এই প্রকল্পের টাকা দেওয়া শুরু হতে পারে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। তবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সব মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় থাকবেন না। যাঁরা আয়কর দেন, সরকারি চাকরি করেন, পেনশন পান কিংবা কোনও সরকারি সংস্থা, পুরসভা বা পঞ্চায়েতের সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। আবেদনকারীর বয়স হতে হবে ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। যাঁদের আবেদন গ্রহণ করা হবে, তাঁদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি তিন হাজার টাকা পাঠানো হবে। তবে সেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার সংযোগ থাকা বাধ্যতামূলক। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনেক উপভোক্তার নাম অন্নপূর্ণা প্রকল্পে সরাসরি স্থানান্তর করা হলেও, নতুন শর্ত মেনেই সুবিধা দেওয়া হবে বলে স্পষ্ট করেছে সরকার।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলের বৈঠকেই প্রকাশ্য ক্ষো’ভ! জাহাঙ্গির ইস্যুতে অভিষেককে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন তুললেন কুণাল-ঋতব্রত, দলের ভিতরে কি শুরু হয়েছে বিদ্রো’হ?
এছাড়াও প্রশাসন জানিয়েছে, যাঁদের নাম এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছে বা যাঁরা এখনও ট্রাইবুনালে মামলা চালাচ্ছেন, তাঁরাও আপাতত অন্নপূর্ণা প্রকল্পের টাকা পাবেন না। ১ জুন থেকে নতুন করে অনলাইন এবং অফলাইনে আবেদন নেওয়া শুরু হবে। অন্যদিকে, নির্বাচনের আগে জমা পড়ে থাকা বহু আবেদন এখনও ঝুলে রয়েছে। আগের সরকার সেই আবেদনগুলির নিষ্পত্তি করতে পারেনি। এখন ডবল ইঞ্জিন সরকার সেই আবেদন নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষ। কারণ একদিকে বেকার ভাতা বন্ধ থাকায় যুবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে অন্নপূর্ণা প্রকল্পের নতুন শর্ত নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সব মিলিয়ে সামাজিক প্রকল্পগুলিকে ঘিরে রাজ্যের রাজনীতি ও প্রশাসনের নজর এখন অনেকটাই বাড়তে চলেছে।






