রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতরে কর্মরত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহলে। আউটসোর্সিং বা থার্ড পার্টি এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ হওয়া হাজার হাজার কর্মীর কাজ, প্রয়োজনীয়তা এবং তাঁদের পেছনে সরকারের ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখতে এবার বিশেষ ‘ম্যানপাওয়ার অডিট’ শুরু করেছে নবান্ন। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বহু কর্মীর মধ্যে। কারণ, এই অডিটের পর কোথাও কর্মী সংখ্যা কমানো বা নতুন করে নিয়োগ কাঠামোয় বদল আনা হতে পারে বলেই আশঙ্কা ঘুরছে বিভিন্ন মহলে।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে রাজ্যের একাধিক সরকারি দফতরে বহু কর্মী সরাসরি সরকারি নিয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং বেসরকারি ভেন্ডর বা থার্ড পার্টি এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করছেন। তাঁদের ঠিক কতজন কোন দফতরে কাজ করছেন, কী ধরনের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, কতদিন ধরে কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে রাজ্য সরকারের কত টাকা খরচ হচ্ছে, সেই সমস্ত তথ্য একত্রিত করতেই এই অডিট প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুধু কর্মীর সংখ্যা নয়, নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখতে চাইছে প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরেই এই নিয়োগ ব্যবস্থাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠছিল, বিশেষ করে আর্থিক অনিয়ম এবং অপ্রয়োজনীয় খরচের অভিযোগ সামনে আসছিল বারবার।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, অতীতে ওয়েবেল বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে বিভিন্ন সরকারি অফিসে পাঠানোর কাজ করত। কিন্তু ২০২৩ সালের পর সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। বর্তমানে কর্মিবর্গ বিভাগের অধীনে থাকা ওয়েবেল টেকনোলজি লিমিটেড সরাসরি কর্মী সরবরাহের দায়িত্ব সামলাচ্ছে। এই বদলের পর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোথাও কোনও অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে কিনা কিংবা অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে কিনা, তা যাচাই করতেই এবার বিস্তারিত অডিটে নামল সরকার। প্রশাসনের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কোনও নির্দিষ্ট মূল্যায়ন ছাড়াই বহু কর্মী বিভিন্ন দফতরে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে বাস্তবে কতটা প্রয়োজন রয়েছে আর কোথায় শুধুই অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে বুঝতেই এই উদ্যোগ।
এই অডিটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নজরে রয়েছে বাংলা সহায়তা কেন্দ্র বা বিএসকে প্রকল্প। রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা সহজে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া এই কেন্দ্রগুলি বর্তমানে প্রায় প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে। প্রশাসনিক হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে প্রায় ৪ হাজার বাংলা সহায়তা কেন্দ্রে কয়েক হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মী কাজ করছেন। প্রতিটি কেন্দ্রে সাধারণত তিনজন করে কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে এবং তাঁদের অধিকাংশই থার্ড পার্টি এজেন্সির মাধ্যমে কাজে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের একাংশের দাবি, বহু বিএসকেতে এখন কাজের চাপ আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গিয়েছে। কোথাও কোথাও প্রায় কোনও কাজই নেই বলেও অভিযোগ উঠছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুল সংখ্যক কর্মীকে মাসের পর মাস বেতন দেওয়ার যৌক্তিকতা কতটা রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ দুর্নী’তি নিয়ে বি’স্ফোরক মন্তব্যের পরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে সাক্ষাৎ! দিল্লির বঙ্গভবনে ঠিক কী কথা হয়েছিল, কেনই বা ‘গোপন বৈঠক’ তত্ত্ব উড়িয়ে দিলেন ঋতব্রত?
যদিও এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনও ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি, তবুও এই অডিট ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে কর্মীদের মধ্যে। প্রশাসনের তরফে আপাতত জানানো হয়েছে, পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই অডিটের রিপোর্ট সামনে আসার পর কিছু ক্ষেত্রে কর্মী সংখ্যা কমানো, দফতর পুনর্গঠন কিংবা নতুন নিয়োগ নীতির পথে হাঁটতে পারে সরকার। অন্যদিকে, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে কম বেতনে সরকারি পরিষেবা সচল রাখার দায়িত্ব তাঁরাই সামলেছেন। তাই ভবিষ্যতে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।






