‘যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁকে অভিযুক্তই বলব…’, নবান্নের বৈঠকে দৃঢ় কণ্ঠে মুখ্যমন্ত্রী ভুল শুধরে দিয়েছিলেন, কী পরিচয় এই জুনিয়র চিকিৎসকের?

চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, সাদামাটা পোশাক। নবান্নের বৈঠকের  যখন লাইভ স্ট্রিমিং হয়, তখন খুব অল্প সময়ই দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তবে সেই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বৈঠকের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠলেন। তাঁর দৃঢ় ও শান্ত কণ্ঠে মুখ্যমন্ত্রীর ভুল শুধরে দেওয়ার ঘটনাটি অবাক চোখে দেখলেন সেখানে উপস্থিত বাকি জুনিয়র চিকিৎসকরা ও যারা লাইভ স্ট্রিমিং দেখছিলেন, তারাও। ফলে স্বভাবতই সকলের মনে বেশ কৌতূহল জাগে, কে এই জুনিয়র চিকিৎসক?

নবান্নের বৈঠকে জনমানসে সাড়া ফেলে সেই জুনিয়র চিকিৎসকের নাম মনীষা ঘোষ। দমদমের বাসিন্দা এই মনীষা ২০১৮ সালে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে এসবিবিএস পড়তে যান। হোস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করেছেন তিনি। বর্তমানে সেই কলেজেই হাউসস্টাফশিপ করছেন তিনি। হোস্টেলেই থাকেন এখন তিনি।

কী এমন বলেছিলেন তিনি নবান্নের বৈঠকে?

বৈঠকে আলোচনার সময় এক পর্যায়ে যখন স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমের বিরুধে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন জুনিয়র চিকিৎসকরা, সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একজনকে অভিযুক্ত প্রমাণ করার আগে তাঁকে অভিযুক্ত বলা যায়না। অভিযোগ করা যায় কিন্তু অভিযুক্ত বলা যায় না।

মুখ্যমন্ত্রীর সেই কথার প্রেক্ষিতেই তাঁর ভুল শুধরে দেন মনীষা ঘোষ। বেশ দৃঢ় কিন্তু শান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, “যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে অভিযুক্ত বলব। যদি সেই অভিযোগ প্রমাণ হয়, তাঁকে বলব দোষী। ওই ব্যক্তিকে অভিযুক্ত বলা ব্যাকরণ বা আইনের দিকে থেকে ভুল না”। তিনি যখন একথা বলছেন, সেই সময়ই লাইভ স্ট্রিমিংয়ে এক ঝলক দেখা যায় ওই মহিলা চিকিৎসককে। যদিও মনীষার সেই যুক্তি মানেন নি মুখ্যমন্ত্রী।

মনীষা জানান, বৈঠকের যে লাইভ স্ট্রিমিং হচ্ছে, তা তারা জানতেন না। জানলে কী তাঁর উত্তর এমন দৃঢ় হত? মনীষার জবাব, “ওটা জানলেও মনে হয় না আমার কথাবার্তায় কোনও প্রভাব পড়ত। তবে লাইভ স্ট্রিমিং যে হচ্ছে, সত্যিই জানতাম না। আমার মনে হয় না, ভুল করেছি। হলঘরে হলেও বলতাম, তিনি (মুখ্যমন্ত্রী) একা থাকলেও বলতাম”।

তিনি আরও জানান, “সভাঘর থেকে বেরিয়ে যখন দেখলাম এত আলোচনা হচ্ছে, তখন লজ্জা লেগেছিল খুব। ওটা ভেবে বলেছিলাম এমন নয়, বলেই ফেলেছিলাম। আটকাতে পারিনি, কারণ আগের বৈঠক থেকে শুনে আসছি এ সব কথা”।

প্রসঙ্গত, এর আহে প্রশাসনের সঙ্গে জুনিয়র চিকিৎসকদের হওয়া প্রায় সব বৈঠকেই উপস্থিত ছিলেন মনীষা। স্বাস্থ্যভবনে যখন মুখ্য্যসচিবের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়, সেই সময়ও সেখানে ছিলেন তিনি। মনীষার অভিযোগ, ওই বৈঠকেও স্বাস্থ্যসচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গেলে এ ভাবেই বাধা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য ভবনের বৈঠকেও বলার চেষ্টা করেছিলাম মুখ্যসচিবকে। কিছুটা বলতেও পেরেছিলাম যে, কেন আমরা অভিযোগ করছি। সেখানে বলা হয়, সব প্রশ্নের উত্তর কি দিতে হবে? আমরা বলেছিলাম, কারণটুকু অন্তত বলুন। যত বার স্বাস্থ্যসচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছি, দমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এটা বলতে পারবে না”।

মনীষার কথায়, “এই বৈঠকেও যখন বলা হল, এটা বলা যাবে না, তখন মনে হল, নাহ্, এটা বলি। আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। ব্যাকরণগত দিক থেকে যে ভুল নই, এটুকু জানতাম। কাল যে শরীরী ভাষা দেখা গিয়েছে প্রশাসনের, যাঁরা দেখেছেন স্ট্রিমিংয়ে, তাঁরা বুঝতে পারবেন স্পষ্ট। আমি সেখান থেকেই বলি যে, অভিযোগ থাকলে অভিযুক্ত বলা যাবে। কেন ওঁকে অভিযুক্ত বলছি, তার প্রমাণ রয়েছে আমাদের কাছে এবং সেগুলি হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়ার মতো নয়”।

আরও পড়ুনঃ পুড়িয়ে মারা হল সাত বছরের নাবালিকাকে, দোষ স্বীকার অভিযুক্তের, ফের ধর্ষণ করে খুন নাবালিকা?

ন্যায় বিচারের দাবীতেই তাদের এই লড়াই বলে জানান মনীষা ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, “সব রাজনৈতিক পরিচয় ফেলে, রং সরিয়ে আমরা যুক্ত হয়েছি ন্যায়বিচারের দাবীতে। কোনও রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তা এখন অতীত। এখন সকলের একটাই পরিচয়, তাঁরা ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের সদস্য”।

RELATED Articles