জীবনে একবার কেউ যখন শিক্ষকতার চাকরিতে যোগ দেন, তখন তাঁর মাথায় থাকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা আর সম্মান। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি হঠাৎ এক আদালতের রায়ে ভেঙে পড়ে? যদি পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়? রাজ্যের বহু শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর কাছে এই দুঃস্বপ্ন আজ বাস্তব। যাঁরা একদিন গর্বের সঙ্গে স্কুলে ঢুকেছিলেন, আজ তাঁরা কর্মহীন, রোজ আন্দোলনে বসছেন, হাতে প্ল্যাকার্ড আর গলায় হতাশা।
একদিকে সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে সামাজিক অপমান— এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ক্রমশ ভেঙে পড়ছেন চাকরিহারারা। কেউ বলছেন, চিকিৎসার খরচ উঠছে না, কেউ আবার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আবারও নতুন করে পরীক্ষা দিতে হবে, এই খবরে যেন মাথার ওপর ফের একতাল বাজ পড়েছে। এর প্রতিবাদে দফায় দফায় আন্দোলন চলছে, তবু সমাধানের মুখ দেখা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, বাতিল হওয়া নিয়োগগুলি আর বহাল থাকবে না, নতুন করে পরীক্ষায় বসতেই হবে। এই সিদ্ধান্তে কার্যত ক্ষুব্ধ চাকরিহারাদের একাংশ। তাঁরা বারবার জানিয়েছেন, তাঁরা আর কোনও নতুন পরীক্ষায় বসতে রাজি নন। ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করার উপায় নেই, পরীক্ষায় বসতেই হবে। এতদিনের আন্দোলন, চিঠিপত্র, আবেদন – সব কিছু মিলিয়েও ফলাফল মেলেনি।
এই পরিস্থিতিতে এবার চাকরিহারাদের ভরসার জায়গা হয়ে উঠছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জানা গিয়েছে, আগামীকাল আলিপুরদুয়ার সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই খবর পেয়ে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাকরিহারারা যোগাযোগ শুরু করেছেন আলিপুরদুয়ারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে। কলকাতার আন্দোলনরত শিক্ষকরাও এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের আশা, যদি মোদির কাছে তাঁদের বক্তব্য পৌঁছানো যায়, তবে হয়তো কোনও বিকল্প সমাধান বেরোতে পারে।
আলিপুরদুয়ারের চাকরিহারা শিক্ষিকা মৌমিতা পাল বলেন, “আমরা শুধু মাত্র পাঁচ মিনিট সময় চাই প্রধানমন্ত্রী মোদির। উনি আমাদের কথাটা শুনুন। আমাদের যন্ত্রণা, ভবিষ্যতের অন্ধকারটা বুঝুন। স্থানীয় সাংসদ থেকে শুরু করে বিজেপির জেলা সভাপতি, জেলাশাসক— সবাইকে জানানো হয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা, সুযোগটা আসবে কি না।” অন্যদিকে চাকরিহারা শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল জানান, “আমাদের প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই চেষ্টা করছেন মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। জানি না সুযোগ হবে কিনা, তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
আরও পড়ুনঃ Ssc: “অযোগ্য” তকমা নিয়ে অপমান! কালীঘাটের সামনে উত্তাল হলেন প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষিকারা!
বছরের পর বছর ধরে আন্দোলন, আশ্বাস, চিঠিপত্র— সব মিলিয়ে আজ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ভরসার জায়গা ক্রমশ ক্ষীণ। এই অবস্থায় তাঁদের শেষ ভরসা এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। যদি তিনি কথা শোনেন, যদি তিনি কোনও আশ্বাস দেন— তাহলে হয়তো আবার ঘরে ফিরতে পারবেন এই শিক্ষকেরা। চাকরি ফিরে পাওয়ার আশাতেই তাঁরা শেষ চেষ্টা করতে চাইছেন। তাঁদের আশা, মোদি অন্তত “শিক্ষা” আর “শিক্ষক”-এর গুরুত্ব বুঝবেন এবং অবহেলিত এই শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াবেন।





