ব্রিগেডের মঞ্চে ৯৭ বছরের বৃদ্ধের পা ছুঁয়ে প্রণাম মোদীর! কে এই মাখন লাল সরকার, যার সঙ্গে জড়িয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আন্দোলনের ইতিহাস? ফাঁস হলো বিজেপির আদি লড়াইয়ের অজানা অধ্যায়!

শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী থাকেনি বাংলা, দেখা গেল এক আবেগঘন মুহূর্তও। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিজেপি কর্মীরা। কিন্তু এত বড় রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের মধ্যেও সবার নজর কাড়লেন এক ৯৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ। তাঁকে দেখেই মঞ্চ থেকে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরেন প্রধানমন্ত্রী মোদী, তারপর নিচু হয়ে স্পর্শ করেন তাঁর পা। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকের মনেই প্রশ্ন ওঠে, কে এই প্রবীণ ব্যক্তি, যাঁকে এত সম্মান জানালেন প্রধানমন্ত্রী?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই বৃদ্ধের নাম মাখন লাল সরকার। শিলিগুড়ির বাসিন্দা এই মানুষটি শুধু বিজেপির পুরনো কর্মী নন, তিনি ভারতীয় জনসঙ্ঘের শুরুর দিনের এক লড়াকু সৈনিক। আজকের বিজেপি যে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে দেশের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে, সেই ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী ছিলেন তিনি। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের কথায়, মাখন লাল সরকার এমন এক ব্যক্তি, যাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সংগ্রামের স্মৃতি।

রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ১৯৫২ সালে কাশ্মীরে তেরঙা পতাকা উত্তোলনের ঐতিহাসিক অভিযানে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম সঙ্গী ছিলেন মাখন লাল সরকার। সেই সময় কাশ্মীরে আলাদা নিয়ম ও পারমিট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল জনসঙ্ঘ। “এক দেশ, এক বিধান” দাবিতে আন্দোলনের সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাশ্মীরে যান মাখন লাল। আন্দোলনের সময় তাঁকেও গ্রেফতার করে কাশ্মীর পুলিশ। পরে জেলের মধ্যেই রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয় শ্যামাপ্রসাদের। সেই কঠিন সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন মাখন লাল সরকার। বিজেপির বহু প্রবীণ নেতা মনে করেন, বাংলায় জনসঙ্ঘের আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি ঘটনা আজও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে কিংবদন্তির মতো শোনা যায়। কংগ্রেস আমলে একবার দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার অভিযোগে দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে আদালতে তোলে। বিচারক তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ দিলেও তিনি মাথা নত করতে রাজি হননি। বরং স্পষ্ট ভাষায় জানান, দেশপ্রেমের গান গাওয়া কোনও অপরাধ হতে পারে না। বিচারক তখন সেই গান শুনতে চাইলে ভরা আদালতেই আবার গান গেয়ে শোনান তিনি। তাঁর সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ হন বিচারক। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সম্মানের সঙ্গে মুক্তি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, বাড়ি ফেরার জন্য ট্রেনের টিকিট এবং অতিরিক্ত অর্থও দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বিজেপি নেতারা।

রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গে বিজেপির সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা ছিল মাখন লাল সরকারের। ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় সংগঠন তৈরি করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। তখন বিজেপির জনভিত্তি প্রায় ছিল না বললেই চলে। সেই সময় শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলার প্রথম সভাপতি হন মাখন লাল সরকার। পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলায় ঘুরে ঘুরে তিনি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার সদস্য সংগ্রহ করার কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই সময় এই সাফল্য ছিল অত্যন্ত বিরল।

১৯৮১ সাল থেকে টানা সাত বছর জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। তখনকার সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী এত দীর্ঘ সময় একই পদে থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলের প্রতি নিষ্ঠার কারণেই তাঁকে বারবার দায়িত্বে রাখা হয়েছিল। বিজেপির পুরনো কর্মীদের দাবি, উত্তরবঙ্গে দলের ভিত শক্ত করার পেছনে যাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাখন লাল সরকার।

আরও পড়ুনঃ শুটিং ফ্লোরেই আচমকা গর্ভপাত! ‘কম্পাস’-এর শুটিং চলাকালীন বড় বিপদ, মা হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে চোখের জলে অন্বেষা রায় মুখোপাধ্যায়! হাসপাতালে ভর্তি অভিনেত্রী! এখন কেমন আছেন?

শনিবার ব্রিগেডের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মোদীর পা ছুঁয়ে প্রণামের দৃশ্য তাই শুধুমাত্র রাজনৈতিক সৌজন্য ছিল না বলেই মনে করছেন অনেকেই। সেটি ছিল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসকে সম্মান জানানোর মুহূর্ত। একদিকে বাংলায় বিজেপির নতুন অধ্যায়ের সূচনা, অন্যদিকে সেই লড়াইয়ের আদি দিনের এক সৈনিককে সম্মান দুই প্রজন্মের সেই মেলবন্ধনই যেন ধরা পড়ল ব্রিগেডের মঞ্চে। শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে তাই রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি আবেগও ছুঁয়ে গেল সাধারণ মানুষকে।

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

আরও অন্যান্য খবর