করোনার ভয়াবহতা এখন গ্রাস করেছে গোটা দেশকে। এর মধ্যেই চিরাচরিত ঐতিহ্য মেনে মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা ও রথযাত্রা পালিত হবে। কিন্তু, এবার প্রবেসেট অনুমতি থাকবে না কোনো ভক্তের। রথযাত্রার দু’দিন আগেই মন্দিরের সমস্ত পথ সিল করে দেবে পুলিশ। শুধু তাই নয়, শ্রীমন্দিরের স্নানবেদিতে তিনদেবতার স্নানপর্বও এবার দেখতে পারবেন না কোনো ভক্তই। কারণ, চলতি করোনার আবহে জগন্নাথের স্নানযাত্রার আগের দিন অর্থাৎ ৪ জুন থেকে মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে ১৪৪ ধারা জারি করা থাকবে। পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ ভক্তসমাগম আটকাতে আজ অর্থে ১লা জুন থেকেই পুরীগামী সমস্ত ট্রেন ভুবনেশ্বরেই থামিয়ে দেওয়ার সিন্ধান্ত ওড়িশা সরকারের। তাই শিয়ালদহ থেকে দুরন্ত এক্সপ্রেস ছাড়লেও তা শ্রীক্ষেত্রে যাবে না। অবশ্য এরই মধ্যে কেন্দ্রের নির্দেশে দেশে ‘আনলক-১’ পর্ব শুরু হউয়েছে।যার জেরে আগামী ৮ জুন থেকে পুরী, কোনারক, লিঙ্গরাজ সমস্ত মন্দিরেই শর্তসাপেক্ষ প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে ওড়িশা সরকার।
পুরীর মন্দিরের সেবায়েত ও পুজারিদেরই স্নানযাত্রায় উপস্থিতিত থাকতে দিতে তীব্র আপত্তি ছিল ওড়িশা সরকারের। ৫ জুন জগন্নাথদেবের পুজোয় যাঁর পালা আছে একমাত্র তিনি ও পুরীর রাজার প্রতিনিধি ছাড়া বাকিদের কাউকে স্নানবেদিতে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি জেলাশাসক। কিন্তু, মন্দির পরিচালন কমিটির জোরাজুরিতেই সমস্ত সেবায়েত, শিঙ্গারি, দৈতাপতি, পুজারিদের স্নানবেদিতে থাকার অনুমতি দিয়েছে সরকার।বস্তুত এই কারণেই মন্দিরের সমস্ত সেবায়েত ও পুজারি এবং দৈতাপতিদের আজ, সোমবার থেকে লালারস নিয়ে করোনার পরীক্ষা হবে। যদি কোনও সেবায়েতের করোনা সংক্রামিত হয় তাহলে তিনি ও তাঁর পরিবারকেউই স্নানাযাত্রায় আসতে পারবেন না।
মন্দির পরিচালন কমিটির অন্যতম সদস্য ও প্রধান শিঙ্গারী নীলকণ্ঠ মহাপাত্র রবিবার জানিয়েছেন, “প্রায় ৭৫ দিন পর স্নানযাত্রায় পুণ্য লগ্নে দেবতার দর্শন থেকে ভক্তদের বঞ্চিত করা যায় না। যাঁরা ভগবানের নিত্যপুজো করেন, তাঁদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।” মন্দির সূত্রে খবর, ১০ দিন পরে শুরু করেও দেবতার তিনটি রথের মোট ৪২টি চাকার নির্মাণ সম্পূর্ণ করেছেন ‘বিশ্বকর্মা’রা।
ভক্তদের এ বছর দেবতার দর্শন থেকে বিরত রাখায় প্রশ্ন প্রশ্ন উঠেছে, কোভিড-১৯ নির্দেশ মেনে রাজ্য সরকারের প্রচারে ‘বন্দে উৎকল জননী’ কর্মসূচিতে কীভাবে পুরীতে ৩০ হাজার মানুষের জমায়েত হয়? মন্দিরের সামনে পাঁচ হাজার মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ওড়িশা সরকারের জয়গান গাওয়ার সময় যদি করোনা সংক্রমণের ভয় না থাকে তবে জগন্নাথের স্নানযাত্রায় ঠাকুর দর্শনে কি সমস্যা ? অবশ্য সরকারি নিয়মানুযায়ী ৮ জুন থেকে ১০-১২ জন করে ভক্ত ‘সোশ্যাল ডিস্টেন্স’ মেনে পুরীর মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবেন। তাঁরা বেরিয়ে এলে ফের অন্যরা যাবেন। পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করবে পুলিশ ও ওড়িশা স্বাস্থ্যদপ্তর।
কিন্তু অন্যতম এক অভিজ্ঞ সেবায়েত জগন্নাথ দৈতাপতি এদিন বলেন, “প্রথা মেনে স্নানযাত্রার পরদিন থেকে দেবতাদের জ্বর আসে।সেইদিন তিন দেবতাই নিভৃতবাসে চলে যান। তাই মন্দিরের দ্বার বন্ধই থাকে। তাই তখন ভক্তদের জন্য দরজা খুলে কী হবে?”
পুরীর মন্দিরেই পরিচালন কমিটি শনিবারের তিন ঘণ্টার ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন শ্রীমন্দিরের প্রধান সেবায়েত গজপতি মহারাজ দিব্যজ্যোতি সিং দেবও। এছাড়াও ছিলেন মন্দিরের মুখ্য প্রশাসক ড. কিষাণ কুমার, জেলাশাসক বলবন্ত সিং এবং পুলিশ সুপার উমাশঙ্কর দাশ। এবছর শুধু ভক্ত নয়, করোনার জেরে নামাম সংবাদ মাধ্যমের প্রবেশও নিয়ন্ত্রণ করবে রাজ্য সরকার। স্নানযাত্রা ও রথযাত্রা টিভিতে সরাসরি সম্প্রচাটিত করবে ওড়িশার লোক-সম্পর্ক দপ্তর। মন্দির কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, শ্রীমন্দির থেকে বেরিয়ে চিরাচরিত ঐতিহ্য মেনেই নন্দীঘোষ রথে চেপেই গুন্ডিচা মাসির বাড়ি যাবেন মহাপ্রভু। দাদা বলভদ্র ও বোন সুভদ্রাও নিজস্ব রথে চেপে মহাপ্রভুর সঙ্গে যাবেন। সেবায়েত, পুজারি ছাড়া পুলিশ প্রশাসনের অফিসাররা রথ টেনে তাদের মাসির বাড়ি পৌঁছে দেবে। তবে ‘বহুড়া যাত্রা’র মধ্য দিয়ে দেবতারা রথে উঠে যাওয়ার পর পুরীর মন্দির সম্পুর্ন সিল করে দেওয়া হবে। একই নিয়ম মানা হবে, উল্টোরথ ও সোনাবেশে। সেখানেও কোনও ভক্তকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। এতে স্বভাবতই হতাশ হয়েছেন জগন্নাথদেবের লক্ষ লক্ষ ভক্ত।পাশাপাশি এই ঘটনায় কার্যত মাথায় হাত পড়েছে পুরীর কয়েক হাজার হোটেল এবং পর্যটন ব্যবসায়ীদেরও।





