তৃণমূল সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলায় ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার। সরকার বদলের পর থেকেই প্রশাসনিক স্তরে একাধিক পরিবর্তনের ছবি দেখতে শুরু করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) বারবার দাবি করেছেন, তাঁর সরকার সাধারণ মানুষের সরকার হিসেবেই কাজ করবে। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, প্রশাসনিক আচরণেও সেই পরিবর্তনের ছাপ দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করছে বিজেপি শিবির। ট্রাফিক নিয়ম মেনে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ের দাঁড়িয়ে থাকা থেকে শুরু করে বিরোধী দলের বিধায়কদের সরকারি বৈঠকে আমন্ত্রণ একের পর এক ঘটনায় নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে রাজ্যের নতুন সরকার।
চিনার পার্ক এলাকায় আজ অর্থাৎ ২৩ মে, এমনই এক দৃশ্য সামনে এসেছে, যা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। সাধারণত মুখ্যমন্ত্রী বা ভিভিআইপি কনভয় যাওয়ার সময় ট্রাফিক ফাঁকা করে দেওয়া হয়, তৈরি করা হয় গ্রিন করিডর। কিন্তু এবার দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। লাল সিগনালে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়। অন্য সাধারণ গাড়ির মতোই সিগনাল সবুজ হওয়ার অপেক্ষা করছে তাঁর গাড়িও। ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সেই দৃশ্য। সিগনাল সবুজ হওয়ার পরই ধীরে ধীরে কনভয় এগিয়ে যায়। ঘটনাটি সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে যে নতুন মুখ্যমন্ত্রী কি ইচ্ছাকৃতভাবেই সাধারণ মানুষের কাছে ভিন্ন বার্তা দিতে চাইছেন।
আরও পড়ুন: দ্বিতীয় দফায় ইম্পা বিতর্কে নতুন মোড়! অনাস্থা প্রস্তাবের জেরে সিংহাসন হারিয়েছেন, তবু বললেন “আমিই সভাপতি”! নব নিযুক্ত সভাপতি রতন সাহাকে মানতে নারাজ পিয়া সেনগুপ্ত!
প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, গত কয়েক বছরে এমন দৃশ্য রাজ্যবাসী প্রায় দেখেননি। আগে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় যাওয়ার সময় দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হতো সাধারণ মানুষকে। অনেক সময় জরুরি কাজেও সমস্যায় পড়তে হতো পথচলতি মানুষকে। কিন্তু এবার সেই চেনা ছবির বদলে দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িও সাধারণ ট্রাফিক নিয়ম মেনেই এগোচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে শুভেন্দু অধিকারী বোঝাতে চাইছেন যে প্রশাসনের উপরে নয়, আইনের মধ্যেই থেকে কাজ করবে তাঁর সরকার। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে প্রশাসনিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টাও এতে স্পষ্ট।
অন্যদিকে শুধু ট্রাফিক বা প্রশাসনিক আচরণেই নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন বার্তা দিতে শুরু করেছে বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী আগেই বলেছিলেন উন্নয়নের প্রশ্নে কোনও দলাদলি হবে না। সেই বক্তব্যের প্রতিফলন এবার দেখা গেল স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশিকায়। রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির বৈঠকে স্থানীয় বিধায়কদের আমন্ত্রণ জানাতে বলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, সেখানে শাসক-বিরোধী ভেদাভেদ রাখা হচ্ছে না। বেলেঘাটার বিধায়ক কুনাল ঘোষ-কেও বিধানচন্দ্র রায় শিশু হাসপাতালে রোগী কল্যাণ সমিতির বৈঠকে বিশেষ আমন্ত্রিত হিসেবে ডাকা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগমের তরফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আগামী ২৮ মে-র মধ্যে সমস্ত বৈঠক সম্পন্ন করতে হবে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, সরকার পরিবর্তনের পর বিজেপি প্রশাসন শুরু থেকেই এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে চাইছে যা সাধারণ মানুষের নজরে দ্রুত আসে। একদিকে ট্রাফিক নিয়ম মেনে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় চলা, অন্যদিকে বিরোধী দলের বিধায়কদের সরকারি বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া এই দুই ঘটনাই নতুন সরকারের রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। তবে এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন দেখার। কারণ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা শুধু প্রতীকী পরিবর্তনে নয়, প্রশাসনিক কাজে বাস্তব স্বচ্ছতা ও সুবিধা পাওয়ার দিকেও।






