জীবন কখন কোন মোড়ে নিয়ে যাবে, তা বলা মুশকিল। কখনও আর্থিক সঙ্কট, কখনও চাকরি হারানোর ভয়, আবার কখনও সমাজের চাপ—এই সব কিছু মিলিয়ে অনেকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে, যদি কারও উপার্জনের পথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। পাওনাদারদের চাপ, আত্মীয়-পরিজনদের কটাক্ষ, আশপাশের মানুষের তির্যক মন্তব্য—এসব কিছু মিলে মানুষকে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত করে দিতে পারে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে ঘটে গেল এমনই এক ঘটনা, যেখানে এক শিক্ষিকা চাকরি হারানোর পর চরম হতাশায় আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন।
বর্তমান সময়ে আর্থিক অনিশ্চয়তা বহু মানুষের জীবন কঠিন করে তুলছে। কেউ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিচ্ছেন, কেউ বা পরিচিতদের কাছ থেকে টাকা ধার করছেন। কিন্তু যদি সেই ঋণ শোধ করার আগেই চাকরি চলে যায়, তাহলে কী হবে? একদিকে অর্থের টানাপোড়েন, অন্যদিকে পাওনাদারদের চাপ—এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন। হতাশা আর চাপে পড়ে কেউ কেউ চরম সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন। ক্যানিংয়ের এক শিক্ষিকার জীবনেও এমনই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাঁকে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে বাধ্য করে।
ঘটনাটি ক্যানিংয়ের রায়বাঘিনী হাইস্কুলের ইতিহাসের শিক্ষিকা রুমা সিংকে কেন্দ্র করে। ২০১৬ সালের এসএসসি দুর্নীতির কারণে তাঁর চাকরি চলে যায়। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, রুমা ব্যাঙ্ক ও স্থানীয় কয়েকজনের কাছ থেকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে টাকা ধার নিয়েছিলেন। কিন্তু চাকরি চলে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পাওনাদাররা তাঁর বাড়িতে আসতে শুরু করেন। পরিবারের অভিযোগ, রুমা পাওনা শোধের জন্য কিছুটা সময় চাইলে তাঁকে কটাক্ষ করা হয়, এমনকি অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। এই মানসিক চাপ আর সহ্য করতে না পেরে বৃহস্পতিবার রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি।
রুমার হবু স্বামী অনিমেষ জানা জানান, রুমা কিছুদিন ধরেই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু চাকরি হারানোর পর পাওনাদারদের লাগাতার চাপ ও অবমাননাকর আচরণ তাঁকে আরও দুর্বল করে দেয়। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি যখন ঘুমের ওষুধ খান, তখন পরিবারের লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে তড়িঘড়ি তাঁকে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সিসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিবারের আরও দাবি, রুমা একটি সুইসাইড নোট লিখেছিলেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, কোন কোন পাওনাদার তাঁকে মানসিক ভাবে হেনস্থা করেছেন।
আরও পড়ুনঃ SSC Scam : “ব্রাহ্মণ নয়” বলে জামাই অপছন্দ, কিন্তু সরকারি মাস্টার বলে বিয়ে— সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরি গেল, শ্বশুরের কান্না থামছে না!
এই ঘটনার খবর পাওয়ার পরই ক্যানিং থানার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ রুমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে এবং ওই সুইসাইড নোট খতিয়ে দেখছে। যাঁদের বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, শুধুমাত্র চাকরি হারানো নয়, পাওনাদারদের অমানবিক আচরণও কাউকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। সমাজে এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তার জন্য আরও সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।





