সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। এক দশক আগে পশ্চিমবঙ্গে যে পরিবর্তনের ঢেউ আছড়ে পড়ে, এখন সেই পরিবর্তনেরই পরিবর্তন চাইছে বেশীরভাগ রাজ্যবাসীই। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরেই যে নির্মম নেতৃত্ব চলে আসছে রাজ্জে,এর শেষ দেখতে চায় বাংলার মানুষ। ৩৪ বছরের বাম রাজত্বকে হারিয়ে ২০১১ সালে বাংলায় মা-মাটি-মানুষের সরকার গড়ে পশ্চিমবঙ্গবাসী। কিন্তু আখেরে লাভ কিছুই হয় না। সেই বামদের অনুসরণ করেই রাজ্যনীতি চালিয়ে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই হয়ত বাংলাভাগের ফলাফল সম্বন্ধে অবহিত নন। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে ছিলেন হুসেন শাহিদ সুহরাওয়ার্দি। তিনি ‘গ্রেটার কলকাতা হত্যা’ মূলচক্রী ছিলেন। হিন্দু জাতিকে বাঁচানোর জন্য ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মুসলিম লিগের হাত থেকে বাংলাকে ছিনিয়ে আনেন। এখন, এই ঘটনার ৭৪ বছর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায় সুহরাওয়ার্দির মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর ছবি দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হচ্ছে। কিন্তু এই ছবির পেছনের আসল রহস্য কেউ জানেন না। এমনকি, এই ছবির সত্যতা নিয়ে কিছু মানুষ মুখ খোলায়, তাদের গ্রেফতারও করে রাজ্যের পুলিশ।
এখন মমতার সরকারের এক নতুন চল উঠেছে যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা যে কোনও কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বকে ‘বহিরাগত’ বলে দেগে দেওয়া। অথচ, একটু খতিয়ে দেখলেই জানা যায় যে এই সরকারই ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের সময় অন্য রাজ্যের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মেলায় তৃতীয় জোটের জন্য। মমতা সরকারের শাসনকালের এই ফ্যাসিবাদী পরিস্থিতি এখন সকলের চোখে উন্মুক্ত।
এখনও পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ১৩৮ জন বিজেপি নেতা, কর্মী, সমর্থকদের খুন করা হয়েছে। কিছু কিছু মানুষকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা গিয়েছে যাঁদের হাঁটু ভাঁজ করে মাটির সঙ্গে ঠেকে রয়েছে। অথচ, রাজ্যের পুলিশ এই ঘটনাকে খুন বলার সাহসটুকু রাখে না। এই ধরণের ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালানো হয়। এর থেকে লজ্জার বোধ হয় আর কিছু হয় না। কিছুদিন আগেও, পুলিশ স্টেশনের সামনেই এক বিজেপি নেতাকে খুন করা হল, বিজেপি সভায় যোগ দিতে যাওয়ার সময় কত বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলা করা হয়, কিন্তু এই শুধুমাত্র রাজ্যের ‘দিদি’-র ভয়ে কোনও পুলিশ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে অক্ষম। এমনকি, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডার কনভয়ে তৃণমূলের পক্ষ থেকে যে হামলা চালানো হয়, সেই বিষয়েও রাজ্যের প্রশাসনের তরফে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুসলিম তোষণ তো রয়েইছে। শুধুমাত্র সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ক বাঁচানোর জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনওদিন মুখ খুলতে দেখা যায় না মাননীয়াকে। লজ্জার বিষয় এই যে, পশ্চিমবঙ্গে মা দুর্গার নিরঞ্জনের জন্য হিন্দুদের আদালত থেকে অনুমতি নিতে হয়, কিন্তু মুসলিমদের নিজেদের উৎসব জারি রাখার জন্য সরকার সম্পূর্ণ অনুমতি দিয়ে দেয়।
এমনকি, করোনার পরিস্থিতির জন্য লকডাউনের সময়ও সংখ্যালঘুদের উৎসবে কোনওরকম বাধা দেয়নি মমতা সরকার। খুব অদ্ভুতভাবেই, যখন আস্তে আস্তে লকডাউন শিথিল হতে শুরু করে, তখন অন্যান্য এক একদিন লকডাউন থাকলেও শুক্রবার তা থাকত না যাতে মুসলিমরা নিজেদের উৎসব পালন করতে পারে। এমনকি, রাজ্যের নানান স্থানে মুসলিমরা নানান দাঙ্গা করলেও, সরকার নিজের ভোটব্যাঙ্ক বাঁচানোর চক্করে সেসব দিকে কোনও আমলও দেন নি।
তৃণমূলের থেকে দুর্নীতিকে আলাদা করা যায় না। তৃণমূলের অনেক দুর্নীতির তদন্ত এখনও চলছে। রাজ্যে কর্মসংস্থানের অবস্থাও সমানভাবে খারাপ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই সেজ বন্ধ করে দিলেন, এমনকি এফডিআই-এর বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ালেন। তাঁর শাসনকালে কোনওরকম শিল্প গড়ে ওঠেনি রাজ্যে। রাজ্যের পরিকাঠামো তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমনকি, দুর্নীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের গোটা প্যানেল বাতিল করা হল হাইকোর্টের পক্ষ থেকে।
বলাই বাহুল্য, মমতার রাজ্যে হিন্দুদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। হিন্দুদের দমন করে চলছে মুসলিম তোষণ। এমনকি, সিএএ-এর বিরোধিতাও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এর থেকে একটাই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কী এই রাজ্যকে দ্বিতীয় বাংলাদেশ বানাতে চাইছেন মমতা? এর আগেও নিজের অস্তিত্ব স্থাপনের জন্য দু’বার লড়াই করেছে বাঙালিরা। এরপর তৃণমূল সরকার চলতে থাকলে আমাদের হয়ত অস্তিত্ব বজায়ের জন্য তৃতীয় লড়াই লড়তে হবে।
গত এক দশক ধরে পরিকাঠামো গড়তে রাজ্য সরকার দ্বিগুন ঋণে জর্জরিত হয়েছে। সামনেই বিধানসভা নির্বাচন, তাই এখন আবার শাসকদলের পক্ষ থেকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া শুরু হয়েছে। এবার সিদ্ধান্ত জনগণের, তারা কী ফের অস্তিত্ব গঠনের লড়াইয়ে নামবে, না কী নিজেদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে এই সরকারকে বিদায় জানাবে।





