রাতের নিস্তব্ধতা, হাসপাতালের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা অস্বস্তিকর নীরবতা আর তার মাঝেই ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। শহরের ব্যস্ততম চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর একটিতে এমন অব্যবস্থার ছবি সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে। রোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য যেখানে নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় ভরসা হওয়ার কথা, সেখানে কেন এমন ফাঁকফোকর? সেই উত্তর খুঁজতেই তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত একটি লিফট দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে। নাগেরবাজারের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর থেকেই সামনে আসতে শুরু করেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, মাত্র এক মাস আগেই নতুন করে লিফটম্যানদের নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নিয়োগের সঙ্গে ছিল না কোনও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ। শুধু লিফট চালানোর প্রাথমিক নিয়ম শিখিয়েই দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের হাতে, যা এখন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে পুরো ব্যবস্থাকেই।
পুলিশি জেরায় ধৃত লিফটম্যানদের বয়ান আরও উদ্বেগজনক ছবি তুলে ধরেছে। তাঁদের দাবি, নাইট ডিউটির সময় কোনও সুপারভাইজার উপস্থিত থাকতেন না। ফলে দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তাঁরা লিফটের কাছে থাকতেন না। কেউ বিশ্রাম নিতেন, কেউ গান শুনতেন, আবার কেউ আড্ডায় মেতে উঠতেন। ঘটনাদিনেও নাকি একই চিত্র ছিল। লিফটের আশেপাশে কেউ উপস্থিত না থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি, যা শেষ পর্যন্ত বড়সড় বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, লিফটের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল একটি সংস্থার হাতে, আর লিফটম্যান সরবরাহের দায়িত্ব অন্য একটি সংস্থার। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে নতুন সংস্থা দায়িত্ব নেয় এবং তখনই নতুন কর্মীদের নিয়োগ করা হয়। কিন্তু সেই সংস্থার পক্ষ থেকে কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ধৃতরা জানিয়েছেন, লিফট মাঝপথে থেমে গেলে কীভাবে সেটি চালু করতে হয়, শুধু সেইটুকুই শেখানো হয়েছিল। কিন্তু যদি বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, তখন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, তা নিয়ে কোনও নির্দেশই দেওয়া হয়নি।
ঘটনার দিন কী ঘটেছিল, সেই বর্ণনাও দিয়েছেন অভিযুক্তরা। তাঁদের কথায়, চিৎকার শুনে তাঁরা বেসমেন্টে পৌঁছন ঠিকই, কিন্তু প্রথমে বুঝতেই পারেননি আসল বিপদ কোথায়। তাঁরা ভেবেছিলেন, যাত্রীরা লিফটের ভেতরে আটকে রয়েছেন। বাস্তবে তখন অরূপ ও তাঁর পরিবার লিফট ও গ্রিলের মাঝখানে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। পরে উপরের তলায় গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে লিভার টেনে লিফট তোলার চেষ্টা করেন লিফটম্যানরা। সেই সময়ই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা, লিফটের দরজায় আটকে থাকা অবস্থাতেই অরূপকে নিয়ে উপরে উঠতে থাকে লিফট, এবং শেষ পর্যন্ত তিনি লিফট ও দেওয়ালের মাঝে পিষে যান।
আরও পড়ুনঃ West Bengal SIR: ভোটার তালিকায় বড় চমক! ৬০ লক্ষের যাচাইয়ের মাঝে হঠাৎ সামনে এল নতুন অঙ্ক আরও ১৩ লক্ষ নাম উধাও!
এই ঘটনায় এখন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে বড় প্রশ্ন কেন কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ করা হল কর্মীদের? আর সেই গাফিলতির মাশুল কি দিতে হল এক নিরপরাধ মানুষের প্রাণ দিয়ে? তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্তৃপক্ষকে জেরা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এই ঘটনার পর শহরের হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।





