সকাল হতেই ভিড় জমেছে গ্রামের রাস্তায়। শিশুর কাঁধে তেরঙা, কিশোরের হাতে ফুল, প্রবীণের মুখে অশ্রুজল—এই ছবিই ধরা পড়েছে নদিয়ার তেহট্টের পাথরঘাটায়। যেন এক যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি প্রান্তে। কেউই আর ঘরে বসে থাকতে পারছেন না। ‘ভারতমাতা কি জয়’ স্লোগানে মুখরিত গোটা এলাকা। চোখের জল মুছেও কাজ নেই, হৃদয়ে গাঁথা বেদনার ছাপ মুছে যাচ্ছে না কিছুতেই।
যিনি জন্মেছিলেন এই মাটিতে, বড় হয়েছেন প্রতিবেশীদের ভালবাসায়, তিনিই আজ ফিরলেন নীরবতায়। তফাত শুধু একটা—এবার তাঁর সঙ্গে ফিরল একটা দেশের ইতিহাস। গ্রামের প্রতিটি মানুষ যেন হয়ে উঠলেন তাঁর আপনজন। তাঁর দাদা—নিজেও সেনার সঙ্গে যুক্ত—নিজের কাঁধে ভাইয়ের কফিন তুলে নিলেন। বুক ফাটা কান্না, গর্ব, আবেগ—সব একসঙ্গে মিশে তৈরি করল এক অপূর্ব দৃশ্য। ঝন্টুর কফিন যাত্রা যেন শুধু একজন সৈনিকের নয়, গোটা গ্রামের সম্মানবোধের বহিঃপ্রকাশ।
গত সপ্তাহে কাশ্মীরের উধমপুরে জঙ্গি হামলার ঘটনার পর সেনা-জঙ্গির লড়াই শুরু হয়। সেই লড়াই চলাকালীন অপারেশনেই শহিদ হন বাংলার বীর সন্তান ঝন্টু আলি শেখ। এই দুঃসংবাদ গত বৃহস্পতিবার পৌঁছায় তাঁর পরিবারের কাছে। তারপর এক গভীর শোকের মেঘ নেমে আসে পাথরঘাটার আকাশে।
শুক্রবার রাতে কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে বারাকপুর সেনাছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয় ঝন্টুর দেহ। সেখানেই তাঁকে গান স্যালুট দেওয়া হয়। শনিবার সকালেই পৌঁছয় গ্রামের বাড়িতে তাঁর কফিন। বাড়ির সামনে উপচে পড়া ভিড়। মা-বাবা বাকরুদ্ধ। মায়ের চোখে অবিরত জল, বাবার গলায় ঘন নীরবতা। ছোটবেলা থেকে যে ছেলেকে কোলে, পিঠে মানুষ করেছেন, সেই ছেলেকে এভাবে বিদায় জানানো অসম্ভব তাঁদের পক্ষে।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলেই তীব্র সংঘাত! সৌগতকে অপমান, আইনজীবীকে রক্তাক্ত করে বিতর্কের মুখে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়!
ঝন্টুর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসে, ছুটি কাটাতে পরিবার নিয়ে এসেছিলেন বাড়ি। তখনও কেউ কল্পনা করেননি এটাই হবে শেষবার। ঝন্টুর স্ত্রী কাশ্মীরে সন্তানদের সঙ্গে থাকতেন। চোখে জল, গলায় আগুন নিয়ে তিনি বলেন, “আমার সন্তানরা বাবাকে হারাল। দোষীদের কঠিনতম শাস্তি চাই।” ২০০৮ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ঝন্টু। সংসার, দায়িত্ব সব সামলে দেশরক্ষায় ছিলেন অটল। তাঁর আত্মত্যাগ আজ শুধু পরিবারের নয়, গোটা বাংলার গর্ব। চোখের জলে নয়, এই শহিদকে স্মরণ করা হবে মাথা উঁচু করে।





