বেলডাঙার সাম্প্রতিক অশান্তি শুধু একটি এলাকার আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে আটকে নেই, বরং তা রাজ্য-রাজনীতির পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ভাঙচুর হওয়া সম্পত্তি এবং ভয়াবহ আতঙ্ক—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক নয়, তা বুঝতে খুব বেশি বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ছে না। এই আবহেই বিষয়টি পৌঁছয় কলকাতা হাইকোর্টের দরজায়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন করে চাপ ও প্রশ্নের পর্ব।
মঙ্গলবার বেলডাঙা সংক্রান্ত শুনানিতে স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করে কলকাতা হাইকোর্ট। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা রাজ্যের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে বাহিনী ব্যবহারের প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী অবস্থান তৈরি হয়েছে। হাইকোর্ট জানিয়ে দেয়, রাজ্য চাইলে কেন্দ্র অতিরিক্ত বাহিনী দিতে বাধ্য এবং প্রয়োজন মনে করলে কেন্দ্রীয় সংস্থা NIA তদন্তেও কোনও আইনি বাধা নেই।
এই প্রেক্ষিতেই সামনে আসে আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। সোমবার, ১৯ জানুয়ারি বেলডাঙায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে দুটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। মামলাকারীর আইনজীবীর বক্তব্যে উঠে আসে, বিক্ষোভের নামে একাধিক সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। রেলের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, জাতীয় সড়ক অবরোধ করা হয়েছে, এমনকি কর্তব্যরত সাংবাদিকদের উপর হামলার অভিযোগও ওঠে। আদালতে দাবি করা হয়, এই অশান্তি ছিল পূর্বপরিকল্পিত, যা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে।
হাইকোর্টের নির্দেশে বর্তমানে বেলডাঙার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা আরও সক্রিয় হয়েছে। জেলা শাসক (DM) ও পুলিশ সুপার (SP)-কে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, মুর্শিদাবাদ জেলায় ইতিমধ্যেই পাঁচ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণের পর প্রয়োজনে আরও কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি কার্যত খোলা রেখেছে কেন্দ্র।
আরও পড়ুনঃ West Bengal : শুনানিতে হয়রানির অভিযোগ ঘিরে তপ্ত সন্দেশখালি, উত্তেজনায় ভাঙচুর বিডিও অফিস!
পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত শুক্রবার, ঝাড়খণ্ডে এক পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর। পরদিন আরও এক শ্রমিক আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ সামনে আসতেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছয়। জাতীয় সড়ক অবরোধ, রেল রোকো, গাড়ি ভাঙচুর থেকে সাংবাদিক নিগ্রহ—সব মিলিয়ে বেলডাঙা কার্যত অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। শনিবার সকালে পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজের নেতৃত্বে র্যাফ ও বিশাল পুলিশবাহিনী অভিযান শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জও করতে হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, এখনও পর্যন্ত ৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে হাইকোর্টের কড়া নজরদারির পর প্রশ্ন একটাই—বেলডাঙায় কি এবার আরও বড় কোনও সিদ্ধান্ত আসতে চলেছে?






