Exclusive: বাংলা দেয়নি সম্মান, ‘দিল বেচারা’ স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট অনিকেত মিত্রকে মাথায় করে রেখেছে মুম্বই

প্রায় এক মাস আগে ডিজনি হটস্টারে মুক্তি পাওয়া সুশান্ত সিং রাজপুতের অভিনীত শেষ ছবি ‘দিল বেচারা’ দেখে চোখের জলে ভাসিয়েছি আমরা সকলেই। ছবিতে মুখ্য চরিত্রে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় এবং স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়-এর মত বাঙালি রয়েছেন, সেই বিষয়টি আমাদের নজরে পড়েছে। কিন্তু জানেন কি এই ছবির স্টোরিবোর্ড আর্টিস্টও একজন বাঙালি? যার আঙ্গুলের প্রতিভায় মুগ্ধ বলিউড থেকে দক্ষিণী ছবির ইন্ডাস্ট্রি। অক্ষয় কুমারের আগামী ছবি ‘পৃথ্বীরাজ’ থেকে শুরু করে বিখ্যাত পরিচালক মণিরত্নমের আগামী ছবি ‘পনিয়ন সেলভন’-এর স্টোরি বোর্ড আঁকার দায়িত্বে রয়েছেন এই কৃতী বঙ্গসন্তান।

সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে একদম অন্যরকম ভাবে পাওয়া গেল অনিকেত মিত্রকে। আপনাদের জন্য রইল সেই দুর্দান্ত সাক্ষাৎকার।

বলিউড থেকে দক্ষিণী ছবির ইন্ডাস্ট্রিতে এই সফল যাত্রার শুরুটা কোথায় প্রশ্ন করা হলে প্রথমেই একগাল হাসেন অনিকেত। জানান যে, বাংলা ছবির প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা তাঁকে এই সিনেমার স্টোরি বোর্ড আর্টিস্ট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গভর্মেন্ট আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে অনিকেত কলকাতার বিভিন্ন বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থায় কাজ করেছেন কিন্তু শিল্পীর মন তো তাই বাঁধাধরা নিয়মে ক্লায়েন্টের ফাইফরমাশ খাটতে ইচ্ছা করত না। প্রায় আট বছর এই যাঁতাকলে নিজেকে পেষার পর এবার ঠিক করলেন যা হবে হোক, ছেড়ে দেবো চাকরি! সেই সময় ডেলয়েট থেকে ডাক আসে তাঁর। কিন্তু নিজের শিল্পীসত্তাকে এতটাই ভালবাসেন এই বঙ্গসন্তান যে বিদেশে সেটল করার লোভনীয় প্রস্তাব এক নিমেষে ফিরিয়ে দেন।

Exclusive: বাংলা দেয়নি সম্মান, 'দিল বেচারা' স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট অনিকেত মিত্রকে মাথায় করে রেখেছে মুম্বই

এরপর প্রায় ছয় মাস ধরে বাংলা টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে একের পর এক প্রোডাকশন হাউস, পরিচালক থেকে প্রযোজকের দোরে দোরে নিজের কাজ নিয়ে ঘোরেন অনিকেত। অফিসে ডেকেও অনেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন না। সেই সময়ের জার্নিটা কেমন প্রশ্ন করা হলে, উত্তরে অনিকেত আমাদের যা জানালেন তা আপনাকে একটু হলেও বিহ্বল করবেই। তাঁর স্ত্রী প্রিয়ম আগরওয়াল যিনি নিজেও একজন শিল্পী এই সময় যদি তাঁর পাশে না দাঁড়াতেন তাহলে আজকে তিনি এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতেন না একথা দৃঢ় গলায় জানান তিনি। এমনও হয়েছে যে প্রিয়ম নিজে সকালে রান্না করে অফিসে চলে গিয়েছেন অনিকেত সারাদিন বাড়িতে বসে আছেন অথচ পরিবারের সবাই বা প্রতিবেশীরা জানতেন যে অনিকেত অফিস গিয়েছেন!

Exclusive: বাংলা দেয়নি সম্মান, 'দিল বেচারা' স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট অনিকেত মিত্রকে মাথায় করে রেখেছে মুম্বই

কিন্তু কলকাতার এই প্রতিভা কলকাতাতেই কোনো দাম পায়নি তাই হতাশ হয়ে আবার কর্পোরেটের খাঁচায় নিজেকে বন্দী করার কথা ভাবছিলেন একদা মুক্ত হওয়া এই পাখি। কিন্তু ঐ যে কথায় বলে না “রাখে হরি মারে কে”, হঠাৎ করেই মুম্বই থেকে অভাবনীয় এক সুযোগ আসে। তখন ২০১৭ সাল। মুম্বই একাডেমি অফ দ্য মুভিং ইমেজ ফেস্টিভ্যালে তাঁর বানানো তিনটি শর্ট ফিল্ম এর মধ্যে একটি শর্টফিল্ম ‘আতর’ মনোনীত হয়। এই ফেস্টিভ্যালের জুরিবোর্ডে ছিলেন দিল বেচারা’র পরিচালক মুকেশ ছাবরা। অনিকেত তাঁর ছবির পুরো কাজ স্টোরিবোর্ডে এঁকে করেন এটাই তাঁর বিশেষত্ব। অনিকেতের কথায়, “আমার কাজ মুকেশ ছাবরার অত্যন্ত ভালো লাগে এবং আমি কলকাতায় ফিরে আসার পর একটা ফোন পাই যে মুকেশ স্যারের আমার কাজ ভালো লেগেছে।” নিজের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মত কোন শব্দ পাননি সেদিন অনিকেত। এরপর কলকাতায় এক বান্ধবীর বাড়িতে কাজ সংক্রান্ত আলোচনা করতে করতেই ফক্সস্টার স্টুডিও থেকে ফোন আসে যে মুকেশ ছাবরার প্রথম ছবি আসছে যেটা ‘দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস’-এর হিন্দি ভার্সন, আপনাকে সেই সিনেমার স্টোরিবোর্ড আঁকতে হবে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থা থেকে একেবারে প্রায় সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে যান অনিকেত। কোনো কিছু না ভেবেই মুম্বইয়ে পাড়ি দেন এই বঙ্গসন্তান।

Exclusive: বাংলা দেয়নি সম্মান, 'দিল বেচারা' স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট অনিকেত মিত্রকে মাথায় করে রেখেছে মুম্বই

তিনি ভেবেছিলেন মুম্বই বিমানবন্দরের ক্লোক রুমে নিজের জিনিসপত্র রেখে ফক্সস্টার-এর অফিসে দেখা করে আবার রাতটা বিমানবন্দরে কাটিয়ে কলকাতায় ফিরে আসবেন! কিন্তু ভাগ্যদেবী অন্য কথা ভেবে রেখেছিলেন তাঁর জন্য, দিল বেচারা ছবির কাজ করতে করতেই বলিউডে অন্যান্য প্রভাবশালীদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। হাউসফুল ৪ ছবির স্টোরিবোর্ডও কিন্তু অনিকেতেরই আঁকা। যেখানে অভিনেতা ভিকি কৌশলের বাবা অ্যাকশন ডিরেক্টর শ্যাম কৌশল যে ছবির অন্যতম পরিচালক শক্তি। অনিকেতের কাজে তিনিও মুগ্ধ। এছাড়াও মুম্বইয়ের বিখ্যাত প্রোডাকশন ডিজাইনার ডুও সুব্রতা চক্রবর্তী এবং অমিত রায়ের অত্যন্ত স্নেহধন্য অনিকেত। মুম্বইয়েই তাঁদের সঙ্গে আলাপ এবং তারপর তাঁদের অনুরোধেই যশ রাজ ফিল্মসে যাওয়া এবং তারপরে ‘পৃথ্বীরাজ’-এর কাজ শুরু করেন অনিকেত। সত্যজিৎ রায় কে গুরু মানা এই বঙ্গসন্তানের নিখুঁত কাজকে বাংলা দাম না দিলেও মুম্বই নগরী কিন্তু এই প্রতিভাকে চিনতে ভুল করেনি।

Exclusive: বাংলা দেয়নি সম্মান, 'দিল বেচারা' স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট অনিকেত মিত্রকে মাথায় করে রেখেছে মুম্বই

সম্প্রতি নেপোটিজম বিতর্কে বলিউড সবথেকে উত্তাল এবং অনিকেত যখন ‘দিল বেচারা’ ছবির সঙ্গে যুক্ত তাঁকে প্রশ্ন করা হল বলিউডে ইনসাইডার বনাম আউটসাইডার বিতর্ক নিয়ে। অনিকেত কিন্তু স্পষ্ট জানালেন যে তিনি সম্পূর্ণ আউটসাইডার হিসেবে সেরকম কোনো বাঁধার সম্মুখীন হননি। তিনি সব সময় সততা এবং ডেডিকেশন কে মূলধন করে এগিয়েছেন এবং সেইজন্যে বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সকলের ভালোবাসাও পেয়েছেন।

Exclusive: বাংলা দেয়নি সম্মান, 'দিল বেচারা' স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট অনিকেত মিত্রকে মাথায় করে রেখেছে মুম্বই

তাঁর এত সাফল্যের পর বাংলা থেকে আস্তে আস্তে ডাক আসা শুরু হয়েছে। ইন্দ্রাশিষ আচার্যের সঙ্গে একটি কাজ সম্প্রতি করেছেন অনিকেত। তিনি আমাদের বারংবার একটা কথা বললেন যে, নিজের শিকড়কে তিনি কোনদিনও ভুলতে পারবেন না। বাংলাতে তিনি কাজ করতে চান। উত্তর কলকাতায় অনিকেত বাংলাকে নিজের বুকের ভেতরে রাখেন সেইজন্যে ফেসবুকে প্রায়শই তিনি যে ছবি এঁকে থাকেন সেখানে কিন্তু বাংলার বিভিন্ন চরিত্রই ফুটে ওঠে। বাংলা বই চন্দ্রহাস, হায়রোগ্লিফিকের দেশে-র প্রচ্ছদ কিন্তু অনিকেতের আঁকা।

Exclusive: বাংলা দেয়নি সম্মান, 'দিল বেচারা' স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট অনিকেত মিত্রকে মাথায় করে রেখেছে মুম্বই

ফেসবুকে হামেশাই তাঁর ছবি চুরি হয়। সেই নিয়ে প্রথমদিকে মন খারাপ বা রিঅ্যাক্ট করলেও এখন অনিকেত এর বক্তব্য যে, এই শিল্পচোররা আর যাই করুক না কেন তাঁর স্বাধীন এবং সৃজনশীল শিল্পসত্তা তো কেড়ে নিতে পারবে না। এই চুরি করা মানুষগুলোকে সেই অনিকেতের কাজের জন্যই অপেক্ষা করে থাকতে হয়। তিনি একটা ছোট্ট ঘটনা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করলেন, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস থেকে নন্দনে ঢোকার যে ছোট্ট গেট, সেখানে ঢুকে দেখা যায় কয়েকজনকে বসতে বিভিন্ন ছবি নিয়ে। অনিকেত-এর বিভিন্ন ছবি প্রিন্ট করে তাদেরকে বিক্রি করতে দেখা দিয়েছে যদিও তারা জানেন না যে ছবিটা কার আঁকা। এপ্রসঙ্গে অনেকেই জানালেন যে এই মানুষগুলো তাঁর ছবি বিক্রি করে যে রোজগার করছে এতে তিনি খুশি হয়েছেন।

Exclusive: বাংলা দেয়নি সম্মান, 'দিল বেচারা' স্টোরিবোর্ড আর্টিস্ট অনিকেত মিত্রকে মাথায় করে রেখেছে মুম্বই

গোরেগাঁও ফিল্ম সিটির কাছে স্বামী স্ত্রী মিলে থাকেন এবং এখন লকডাউনে সারাদিন ওয়ার্ক ফ্রম হোমে আঁকিবুকির মাধ্যমে ভালোই দিন কাটে এই কৃতী দম্পতির। ফেসবুকে লেখালেখিও করেন অনিকেত তাই বই কবে বেরোবে প্রশ্নে সলজ্জ হাসেন এই শিল্পী। নিজের প্রত্যেক দিনের অভিজ্ঞতাকে অথবা বিভিন্ন বাস্তব ঘটনাকে যেভাবে নিজের আঙুলের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলছেন এই বঙ্গসন্তান তা অত্যন্ত ভালোলাগা দেয়। অনিকেত কথার অর্থ গোটা বিশ্বই যার ঘর। নিজের নামের মানে সার্থকভাবে রক্ষা করে চলেছেন এই শিল্পী।

RELATED Articles

Leave a Comment