শরীর ভালো নেই। কিন্তু নিজের ভালোবাসাকে এত সহজে ছাড়বেন কি করে! ফের আবার সকলকে মুগ্ধ করতে আসছেন কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায়। ফের আবার তাঁর কণ্ঠে শোনা যাবে রবীন্দ্র সঙ্গীত।
বয়স ৭৭-এর কাছাকাছি। এদিন মুম্বাই থেকে জানালেন, “শরীর ভালো নেই আমার। পা আর কোমরের যন্ত্রণায় ভুগছি বেশ অনেকদিন ধরে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনা এখন। কিন্তু এই সব প্রতিবন্ধকতা নিয়েও ইচ্ছে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান রেকর্ড করার। এই নিয়ে বহু ভাবনাচিন্তাও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গান তো বাণীপ্রধান। তাই তাঁর বাণীগৌরব এবং সুর অক্ষুণ্ণ রেখে একটু নতুন ভাবে নতুন কিছু গান নিবেদন করতে চাই”।
গান এক প্রকার তাঁর জীবনে প্রথম ভালোবাসা। বাঙালি শ্রোতাদের কাছে তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান বিশেষ মাত্রা পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘ভাঙ্গা গান’ রেকর্ড প্রকাশিত হওয়া নিয়ে জটিলতা হয়েছিল বছর চল্লিশ আগে। সেই সময় ছ’টি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং ছ’টি রবীন্দ্র সঙ্গীত রেকর্ড করেছিলেন আরতিদেবী। এইচএমভি থেকে সেই রেকর্ড করা হয়েছিল। আর রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৭ অথবা ৯৮ সালে। ১৭-১৮বছর ধরে গানগুলো পড়েছিল। একবার বর্ধমানের সংস্কৃতি হলে একটা অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় তিনি ট্রেনের কামরায় উঠে দেখেন কণিকা দেবীকে।
তিনি জানান,”উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমি কী করছি তখন আমি কথার ফাঁকে রেকর্ডিংয়ের কথা বললাম। জানাই যে গানগুলো কিছুতেই প্রকাশিত হচ্ছে না। যখনই কতৃপক্ষকে বলেছি, তখনই ওঁরা এড়িয়ে গিয়েছেন এই বলে যে, বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিচ্ছে না। রেকর্ডিংয়ের সময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বন্দিশগুলোর প্রশিক্ষক ছিলেন এ কানন এবং মালবিকা কানন। আসলে এই গান রবীন্দ্রনাথ নিজেই তৈরি করে গিয়েছেন। যেমন- ‘সুখহীন, নিশিদিন’ এসেছে তারানা থেকে। ‘চরণধ্বনি শুনি’ সিন্দুরা রাগে ধামার।”
এরকমই ৬টি ক্লাসিক্যাল বন্দিশ এবং ৬টি রবীন্দ্রনাথের গান করেছিলেন রেকর্ড। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রশিক্ষক ছিলেন সুবিনয় রায়। খুব সুন্দর রেকর্ডিং হয়ে গেলেও গান প্রকাশিত হল না। গায়িকা জানিয়েছেন, “আমি বলে বলে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। শেষমেশ কণিকাদিও সমস্তটা শুনে রেগে গেলেন। ‘ভাঙ্গা গান’ কলকাতার শিল্পীরা তখনও বড় এক গাইতেন না। কোনও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী বন্দিশ গেয়ে দিতেন আর অন্যজন রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন। এমনকি কণিকাদি বলেন, ‘আমরা এতদিন গান করছি, এটা তো আমরাই ভাবিনি। তুই এত সুন্দর ভাবলি কী করে?”
এরপর উনি নিজের উদ্যোগে সেই সময় বিশ্বভারতীর উপাচার্য নিমাই সাধন বসুকে বলেন। এরপরে শান্তিনিকেতন গিয়ে নিমাইবাবু এইচএমভিতে যুগ্মভাবে চিঠি দেন। গায়িকার কথায়, “বিশ্বভারতীর বোর্ডকে ওঁরা বলেছিলেন”। কিন্তু কার জন্য গানগুলো প্রকাশিত হয়নি, তিনি নাম আর বলেননি। অনেকের হয়তো মনে হয়েছিল, যেভাবে গানগুলো গায়িকা গাইছেন তা প্রকাশিত হলে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু এই কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী বলতে নারাজ কে সেই ব্যক্তিত্ব? আফসোস একটাই শেষমেষ আর গানগুলো এসে পৌঁছলো না।
এদিকে বর্তমানে তাঁর ভাবনায় তেমনি কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত রয়েছে। এবার বলেছেন, “রবীন্দ্রনাথ ধ্রুপদ-ধামার যেমন রচনা করে গিয়েছেন, তেমন বেশকিছু স্বল্পশ্রুত হলেও গান বেঁধেছেন। যেমন- আড়খেমটা তালে, পিলু-বরোয়াঁ রাগের গান”। সেসবই এবার তাঁর গাওয়ার ইচ্ছে। এসব গান সেভাবে লোকে গায়না। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সমস্ত কিছু গুলে খেয়েছেন এই ব্যক্তিত্ব।
রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে দিতে তিনি জানান, অতিমারির কারণে দীর্ঘদিন কলকাতা আসা হয়নি। মুম্বাই থেকেই সমস্ত কাজ করে চলেছি। নতুন গানের রেকর্ডিংয়ের কাজও মুম্বাই থেকেই করেছি। তাঁর কথায়, “অন্য যেসব গান থেকে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই গানগুলোর সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে নিবেদন করার ইচ্ছে আছে”।





