অভিশপ্ত একাত্তরের হিন্দু-গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস আজ‌ও বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলাদেশের সেঁদিয়া গ্রাম!

সেঁদিয়া গ্রাম। ইতিহাসের অনেকেই হয়তো এই নামটির সঙ্গে পরিচিত। ইতিহাসের এক নৃশংস হত‍্যাকান্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে এই গ্রামটি। পূর্ববঙ্গের অবিভক্ত ফরিদপুর জেলার একটি প্রত‍্যন্ত গ্রাম এই সেঁদিয়া। ১৯৭১-এ এই গ্রামে যাওয়ার জন্য একমাত্র ভরসা ছিল জলপথ। আর জলযান বলতে ছিল স্টিমার ও নৌকো।

অভিশপ্ত একাত্তরের হিন্দু-গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস আজ‌ও বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলাদেশের সেঁদিয়া গ্রাম!

বর্তমানে এই গ্রামটি বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপ-জেলার খালিয়া ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। মাদারীপুর জেলা সদর থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দূরে এই সেঁদিয়া গ্রাম।মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপ-জেলা ১০৭১-এ ছিল একটি হিন্দুপ্রধান এলাকা। এই গ্রামের আশেপাশেই জন্ম হয়েছিল অম্বিকাচরণ মজুমদার, গৌরচন্দ্র বালা, ফণিভূষণ মজুমদারের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের।
আর তাই হিন্দু-প্রধান এই এলাকা ছিল পাকহানাদারদের মূল লক্ষ্য।

অভিশপ্ত একাত্তরের হিন্দু-গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস আজ‌ও বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলাদেশের সেঁদিয়া গ্রাম!

হিন্দু নিকেশের উদ্দেশ্যে পাক হানাদার বাহিনী ঘাঁটি গেড়েছিল কাছাকাছি টাকেরহাট স্টিমার ঘাটের কাছে। দিনটা ১৯৭১-এর ১৯ শে মে, বাংলার ৫ ই জ‍্যেষ্ঠ, ১৩৭৮, সময় সকাল ৮ টা। ওই দিন পাকিস্তানি সেনার একটি দল লঞ্চে চেপে রওনা দিল গোপালগঞ্জ জেলার ভেনাবাড়ির দিকে। মাদারীপুর জেলার কাদম্বরী ইউনিয়নের চর ছামটায় পৌঁছে তারা সেখানে ব‍্যাপক গুলি চালায় ও লুটপাট করে।

অভিশপ্ত একাত্তরের হিন্দু-গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস আজ‌ও বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলাদেশের সেঁদিয়া গ্রাম!

এরপর তাঁরা পৌঁছোয় উলাবাড়িতে। সেখানেও শুরু গণহত্যা! এরপর সেই অঞ্চল ছেড়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে তাঁরা এগিয়ে যায় সেঁদিয়া গ্রামের দিকে। ঘড়ির কাঁটা তখন সময় জানাচ্ছে বিকেল ৪টে। পাক বাহিনীর সঙ্গে আনসার বাহিনীও সেঁদিয়ার দিকে এগোতে থাকে। চলতে থাকে ব‍্যাপকহারে গুলি আর মাঝে মাঝে আর্তনাদের শব্দ।

অভিশপ্ত একাত্তরের হিন্দু-গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস আজ‌ও বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলাদেশের সেঁদিয়া গ্রাম!

পাক বাহিনী গনহত্যা চালাবে বুঝতে পেরে কাছাকাছি খালিয়া, পালিতা, ছটিয়াবাড়ি গ্রামের হিন্দুরা লুকিয়ে পড়ে পাশেই সেঁদিয়া গ্রামের আখ ক্ষেতে। এরপর পাক বাহিনী যখন সেঁদিয়া গ্রামে পৌঁছায় তখন তাঁরা দেখে, গ্রাম জনশূন্য। সুযোগ বুঝে আনসার বাহিনীর লোকজন ফাঁকা গ্রামে ঢুকে বাধাহীন ভাবে লুটপাট শুরু করে। লুটপাট শেষে গোটা সেঁদিয়া গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। গ্রামের বেশ কিছু বয়স্ক মানুষ জ্বলন্ত আগুনে জীবন্ত পুড়ে মারা যান। আর বাকিরা? অসহায় মানুষগুলো পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যার। আর তারপর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারা হয় তাঁদের।

অভিশপ্ত একাত্তরের হিন্দু-গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস আজ‌ও বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলাদেশের সেঁদিয়া গ্রাম!

আগুন দেখে ভয়ে সেঁদিয়া গ্রামের আখ ক্ষেতের মধ্যে থাকা ছাগলের দল চিৎকার করে ওঠে। আখ ক্ষেতের ভেতরে কিছু নড়াচড়া করতে দেখে সেদিকে লক্ষ্য করে সেমি-অটোমেটিক রিভলবার দিয়ে গুলি ছোঁড়ে পাক বাহিনী। গুলি খেয়ে আখ ক্ষেতের ভেতরেই পাক গুলিতে নিহত হন কয়েকশো নিরীহ সাধারণ মানুষ । ঘটনার ৬ দিন পরে আরও ৫ জনকে ওই গ্রাম থেকে ধরা হয়। তাঁদের সবাইকেই গুলি করে মারে পাক হানাদার বাহিনী।

অভিশপ্ত একাত্তরের হিন্দু-গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস আজ‌ও বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলাদেশের সেঁদিয়া গ্রাম!

১৯৭১-এর ১৯ ও ২০ শে মে দু’দিন ধরে চলে সেঁদিয়া গণহত্যা। জানা যায়, নিহতের সংখ্যা নারী,পুরুষ ও শিশু মিলে ১২৭ জন এবং এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৭৬ জন। একাত্তরের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এভাবেই প্রাণ যায় শয়ে শয়ে হিন্দুর, যাঁদের অনেকের নাম পরিচয় আজও ওই আখ ক্ষেতের আড়ালে অজানাই থেকে গেছে। সময়ের নিয়মে আজ এই ঘটনা শুধুই ইতিহাস। আর হিন্দু হত্যার এই করুণ ইতিহাস আজ ভারাক্রান্ত বাংলাদেশের সেঁদিয়া গ্রাম।

RELATED Articles

Leave a Comment