নজরকাড়া ২১! ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন, আবার ২১ জুলাই কোটা আন্দোলনের জয়, ২১-এই জড়িয়ে বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক ঘটনা!

২১ সংখ্যাটা কেমন যেন বাংলাদেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। না, কোনওরকমের পরিকল্পনা নয়, বরং খুবই কাকতালীয়ভাবেই এই ২১ সংখ্যাটি বাংলাদেশের নানান ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী বহন করছে। একদিকে যেমন ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনের জেরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনই আবার এই ২১ জুলাই দীর্ঘদিন ধরে চলা কোটা আন্দোলনের জয় হয়েছে ওপার বাংলায়। ফলত, ২১ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগ যে রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

সালটা ছিল ১৯৯৯। শতাব্দীর শেষ বছর। সেই বছরই রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সম্মেলনে স্বীকৃতি পেয়েছিল আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিকে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উপলক্ষ্যে। মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিজেদের প্রাণ বলি দেওয়া পড়ুয়াদের এক জয়ই হয়েছিল সেদিন বলা। শুধুমাত্র ওপার বাংলাই নয়, আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও ভাষা দিবস পালন হয় সাড়ম্বরে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে যে রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটেছিল, তা হঠাৎ কোনও স্ফুলিঙ্গ ছিল না। বরং সেই আগুনে ঘি পড়া শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় থেকেই। দেশভাগের সময় যখন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমানে পাকিস্তান) ভাগ হয়, সেই সময় পশ্চিম পাকিস্তানে ঘোষণা করা হয়েছিল যে উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। অন্য কোনও ভাষা নয়।

সেকথা মেনে নিতে পারেন নি পূর্ব পাকিস্তানের কেউই। ফলে জ্বলেছিল আন্দোলনের আগুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ পড়ুয়া ও অভিভাবকরা উর্দু ও ইংরেজি ভাষাকে বয়কট করেন। এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। এদিন বাংলাকে দেশের রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে পথে নেমে আন্দোলন করেন পড়ুয়ারা। সেই আন্দোলনে বাধ সাধে পুলিশ। পুলিশের গুলিতে ভাষাকে ভালোবেসে মৃত্যুবরণ করেন চার ছাত্র। যদিও সরকারি হিসেব অনুযায়ী মৃত্যু চারজনের হলেও, অনেকেই ওইদিন ভাষা শহিদ হয়েছিলেন। সেই থেকেই শুরু হয় ভাষা নিয়ে লড়াই। পাকিস্তান ও উর্দু শাসন থেকে মুক্তি পেতে ও স্বাধীন দেশের জন্ম দিতে চলতে থাকে লড়াই। ১৯৯৯ সালে স্বীকৃতি পায় আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস।

এদিকে আবার সাম্প্রতিক বাংলাদেশে চলতে থাকা কোটা আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে ২১। গত সপ্তাহের প্রথম থেকেই কোটা বিরোধী আন্দোলন আরও বেশি মাথাচাড়া দেয় ওপার বাংলায়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্করণের দাবীতে সংঘর্ষে জড়ায় পড়ুয়া ও ছাত্রলীগের নেতারা। পুলিশের সঙ্গে বাঁধে তুমুল সংঘর্ষ।

এই কোটা বিরোধী আন্দোলনে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৫৩ জনের। আহত দেড় হাজারেরও বেশি। সেই আন্দোলনেই জ্বলতে থাকে গোটা বাংলাদেশ। বাংলাদেশে জারি হয় কার্ফু। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তার বিরোধিতা করে আপিল করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের। গতকাল অর্থাৎ ২১ জুলাই ছিল সেই রায়দান।  

সরকারের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্টের রায়কে বাতিল করার আবেদন জানিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্টে এদিন হাইকোর্টের রায়কে বাতিল করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের তরফে জানানো হয়েছে, এবার থেকে বাংলাদেশে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে ৯৩ শতাংশ। বাকি ৭ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ সুরক্ষিত থাকবে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের জন্য, ১ শতাংশ থাকবে নৃগোষ্ঠীর জন্য আর বাকি ১ শতাংশ সুরক্ষিত থাকবে প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য। সুপ্রিম কোর্টের তরফে এও জানানো হয়েছে যে সরকার চাইলে এই কোটার হার বাড়াতে বা কমাতে পারে। 

এক ২১শে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের জন্য স্বীকৃতি পেয়েছিল ভাষা আন্দোলনের ফলাফল অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস। আর আরও এক ২১শেই জয় মিলল সেই বাংলাদেশেরই কোটা বিরোধী আন্দোলনের। অর্থাৎ এই ২১ সংখ্যাটা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যে জড়িয়ে রয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ২১-কে বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের জয় হিসেবে বললেও, খুব ভুল কিছু বলা হবে কী!

RELATED Articles