প্রতিদিনের মতোই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যখন কলকাতা নিজের ছন্দে ফিরছিল, তখন হঠাৎ করে শহরের বুক চিরে উঠে এল ধোঁয়ার কুন্ডলী। মেছুয়া বাজারের ব্যস্ত রাস্তায়, গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক বহুতল হোটেল থেকে ছড়িয়ে পড়ল আগুনের লেলিহান শিখা। অফিস ফেরতা মানুষ, বাজারে ব্যস্ত ক্রেতা-বিক্রেতা—সবাই হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন, কী হচ্ছে চারপাশে! ধোঁয়ার গন্ধে দমবন্ধ পরিবেশ, আর ততক্ষণে মানুষ বুঝে গিয়েছে—ঘটনা কিছু বড়।
এই শহরে যারা দিনভর রুজির টানে ছুটে বেড়ান, রাত নামলে একটুখানি মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজেন, তাদের জন্য হোটেল মানে একটু শান্তি, একটু আশ্রয়। কিন্তু মঙ্গলবার সেই আশ্রয়ই হয়ে উঠল মৃত্যু ফাঁদ। কেউ এসেছিলেন কাজের সূত্রে, কেউ বা চিকিৎসা করাতে; কে জানত, রাতটা শেষ হবে না? যে হোটেলে রাত কাটানোর কথা ছিল, সেখানেই যেন ঘুমিয়ে পড়লেন চিরতরে।
হোটেলটিতে আগুন লাগে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আগুন ও ধোঁয়া। হোটেলে সেসময় ছিলেন ৮৮ জন অতিথি। আগুন এতটাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে অনেকে আটকে পড়েন ঘরের ভিতরেই। প্রাণ বাঁচাতে একাধিকজন জানালা থেকে লাফ দেন। তাদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। বাকি মানুষজনকে উদ্ধারে রাতভর লড়াই চালান দমকল কর্মীরা।
প্রায় আট ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর উদ্ধারকারীরা একে একে হোটেলের ভিতর থেকে বের করে আনেন দেহগুলি। প্রথমে এক, তারপর দুই—ধীরে ধীরে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় ১৩-তে। আর একজন আগেই ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। সবমিলিয়ে প্রাণ গেল ১৪ জনের। তাঁদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। বেশ কয়েকজন ছিলেন ভিনরাজ্যের বাসিন্দা। খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পৌঁছান মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং মন্ত্রী শশী পাঁজা। ঘটনার পর থেকেই পলাতক হোটেল মালিক।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার খবর পেয়েই শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মৃতদের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে তিনি জানিয়েছেন, এই দুঃখের সময়ে তাঁদের পাশে আছে কেন্দ্র। জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা ও আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন মৃতদের পরিবার।
ঘটনার পরেই কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দুঃখজনক এই সময়ে কেন্দ্রের পাশে থাকা প্রয়োজন ছিল, যা তিনি করেছেন।”
আরও পড়ুনঃ Weather update : সপ্তাহে টানা ঝড় বৃষ্টির পূর্বাভাস! রাজ্যে জারি হলুদ সতর্কতা, কি বলছে আবহাওয়া দপ্তর?
এদিকে তদন্তের স্বার্থে কলকাতা পুলিশ ইতিমধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন—“হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন ছিল? আগুন নির্বাপণের কোনও ব্যবস্থা ছিল না?”—এই ঘটনার পর শহরজুড়ে উঠছে এমন নানা প্রশ্ন। তবে আপাতত গোটা শহর শোকস্তব্ধ, এক বিভীষিকাময় রাতের দুঃসহ স্মৃতি যেন কেউ ভুলতে পারছে না।






