কালীপুজোর সন্ধ্যা মানেই আলোর ঝলকানি, আতসবাজির রঙিন উৎসব। কিন্তু আনন্দের সেই রঙিন আলো অনেক সময় ঢেকে দেয় আতঙ্কের অন্ধকার— বিশেষ করে নিরীহ প্রাণীদের জীবনে। সোমবার এমনই এক ভয়াবহ দৃশ্যের সাক্ষী রইল কলকাতার মেট্রো রেল। বাজির বিকট শব্দে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে এক পথকুকুর আশ্রয়ের খোঁজে উঠে পড়ল চলন্ত মেট্রো ট্রেনে! অবশেষে এই অদ্ভুত ঘটনাকে স্বীকার করল মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষও।
রেলের তরফে জানানো হয়েছে, কালীপুজোর রাতে শব্দবাজির তাণ্ডবে আতঙ্কিত হয়ে অনেক পথকুকুরই মেট্রো স্টেশনের ভিতরে ঢুকে পড়ে। তারা নিরাপদ জায়গা খুঁজছিল। সেই সময় একটি কুকুর গিরিশ পার্ক স্টেশন থেকে সরাসরি ট্রেনে উঠে পড়ে। মেট্রোর সিকিউরিটি কর্মীরা বিষয়টি টের পেয়ে কুকুরটিকে সাবধানে নামিয়ে দেয়। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, কোনও প্রাণীর ক্ষতি করা হয়নি, বরং সুরক্ষার ব্যবস্থা করেই তাকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে এখানেই শেষ নয়। সূত্রের খবর, কেবল গিরিশ পার্ক নয়, আরও কয়েকটি মেট্রো স্টেশনেও এদিন পথকুকুরদের ঢুকে পড়ার খবর মিলেছে। কিন্তু সে বিষয়ে রেলের কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। রেল জানায়, তারা সব সময় নজর রাখে যাতে কোনও অনুপ্রবেশকারী—মানুষ বা প্রাণী— মেট্রোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে। তবে এই ঘটনাটি যে নাগরিক দায়িত্বহীনতারই প্রতিফলন, তা মেনে নিচ্ছেন অনেকেই।
আসলে দীপাবলি ও কালীপুজোর রাতে বাজির শব্দ শহরজুড়ে ভয়ঙ্কর আকার নেয়। নিষিদ্ধ শব্দবাজির পরোয়া না করে অনেকেই আতশবাজি ফাটাতে থাকেন। তার ফলে শুধু মানুষের কানেই তালা লাগে না, ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পশুপাখি, এমনকি বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষও। পশুদের শ্রবণশক্তি মানুষের চেয়ে বহু গুণ বেশি, তাই তাদের কাছে এই বাজির আওয়াজ একপ্রকার মরণফাঁদ। ভয় পেয়ে তারা ছুটে বেড়ায় আশ্রয়ের খোঁজে, অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে।
এদিকে, শব্দবাজির পাশাপাশি শহরের বায়ুদূষণও মারাত্মক হারে বেড়েছে। কালীপুজোর রাতে কলকাতার বাতাসের মান সূচক (AQI) ছাড়িয়েছে ১০০-এর গণ্ডি। যা ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে যাঁদের অ্যাজমা বা সিওপিডি রয়েছে, তাঁদের পক্ষে পরিস্থিতি ভয়াবহ। পরিবেশবিদদের মতে, বারবার সতর্কবার্তা, সরকারি নিষেধাজ্ঞা, এমনকি জরিমানার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও মানুষ নিজের মর্জিমতো বাজি ফাটাতে ব্যস্ত। আর তারই ফল — ভয়ে কাঁপা পথকুকুর, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া আকাশ, আর ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে ওঠা শহরের বাতাস।
আরও পড়ুনঃ Diwali Celebration 2025: হোয়াইট হাউসে দীপাবলির আলোয় ট্রাম্প-মোদীর বন্ধুত্ব ও বাণিজ্য আলোচনা! কূটনৈতিক মহলে সৃষ্টি নতুন গুঞ্জন!
এই ঘটনার পর শহরবাসীর একটাই প্রশ্ন— আনন্দের নামে যদি এতটা নিষ্ঠুরতা হয়, তবে আলোর উৎসবের মানে কোথায়? যে প্রাণীরা আমাদের শহরেরই অংশ, তাদের ভয় আর যন্ত্রণার মধ্যেই যদি আমাদের উৎসবের আনন্দ খুঁজে নিতে হয়, তবে সেটাই কি সভ্যতার পরাজয় নয়?





