Kalyan Banerjee : ‘‘এই দলে মহিলাদেরই দাম, পুরুষদের নয়’’— ক্ষোভে মুখ্য সচেতকের পদে ইস্তফা কল্যাণের, মহুয়া-মমতার ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন!

সপ্তাহের শুরুতে তৃণমূল সাংসদদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে বসেছিলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে রাজ্যসভা দলের কাজ নিয়ে প্রশংসা করলেও, লোকসভার সাংসদদের মধ্যে ‘সমন্বয়ের অভাব’ নিয়ে স্পষ্টত অসন্তোষ প্রকাশ করেন নেত্রী। দলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, এই মন্তব্যেই চরম অস্বস্তিতে পড়েন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই বৈঠক মিটতেই আচমকাই তিনি দলনেত্রীকে ইস্তফাপত্র পাঠান। কল্যাণের এমন সিদ্ধান্তে অস্বস্তিতে পড়ে যায় শাসকদল। যদিও পুরো ঘটনাক্রমের গভীরে রয়েছে আরও জটিলতা।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, দিদি তাঁর উপর আস্থা রাখতে পারেননি। তৃণমূল সাংসদ বলেন, তিনি সংসদে ও মামলার কাজ একসঙ্গে সামলাচ্ছেন, আর সেই পরিস্থিতিতে দিদির ‘সমন্বয়হীনতার’ অভিযোগ তিনি মেনে নিতে পারেননি। কল্যাণ জানান, সংসদের বিভিন্ন আলোচনার আগে তিনি দিদিকে সব জানান। তবুও নেত্রীর এমন অভিযোগে তিনি অপমানিত বোধ করেন। একইসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লোকসভার দলনেতা হিসেবে নির্বাচন নিয়ে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। বরং, অভিষেকের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে বলেই জানান। সূত্রের খবর, কল্যাণের ইস্তফার পর অভিষেক তাঁকে ফোন করে অনুরোধ করেন আরও কয়েক দিন আগের মতো কাজ চালিয়ে যেতে এবং ৭ অগস্ট দিল্লিতে বসে আলোচনার আশ্বাস দেন।

যদিও শুধু দিদির মন্তব্য নয়, কল্যাণের ক্ষোভের আগুন ঘি-ঢেলে উস্কে দিয়েছে সহ-সাংসদ মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে পুরনো বিবাদ। সোমবারই ‘এক্স’-এ দীর্ঘ পোস্ট করে মহুয়ার বিরুদ্ধে তোপ দাগেন কল্যাণ। এক পডকাস্টে মহুয়ার ‘শূকরশাবক’ উপমার উল্লেখ করে কল্যাণ লেখেন, ওই মন্তব্য সাধারণ নাগরিক রীতির পরিপন্থী। শুধু তাই নয়, লোকসভায় ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে আলোচনার সময়ও মহুয়ার নাম আসায় কল্যাণ সংসদে না-থাকার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছেন। এই সব ছোট ছোট ঘটনা ধীরে ধীরে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয় দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে।

সোমবার বিকেলে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিয়োয় দেখা যায়, দিল্লির এক বাংলোর সামনে মহুয়া ও কল্যাণ প্রায় মুখোমুখি। মহুয়াকে দেখে কল্যাণের স্বগতোক্তি— “আজকে দিনটা গেল রে!”— এই দৃশ্যই যেন স্পষ্ট করে দেয়, দুই সাংসদের মধ্যে চাপা আগুন এখনও জ্বলছে। অতীতে মহুয়ার সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সামনে কল্যাণের তীব্র বাদানুবাদ, এমনকি মহুয়ার ‘অ্যারেস্ট’ বলার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। সেই সময় দলে চিঠি দিয়ে অভিযোগ জানান মহুয়া। এমনকি প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায়ের সঙ্গেও কল্যাণের কথার লড়াই প্রকাশ্যে আসে। সব মিলিয়ে বহু দিন ধরেই কল্যাণকে নিয়ে অস্বস্তি ছিল দলের অন্দরমহলে।

আরও পড়ুনঃ ৬ দিন বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সতর্কতা! জলমগ্ন হতে পারে একাধিক জেলা

এতকিছুর পরেও এখনই কল্যাণের ইস্তফা গৃহীত হয়নি। তবে দলের একাংশের মতে, এই পরিস্থিতি মিটতে পারে অভিষেকের সঙ্গে তাঁর নির্ধারিত বৈঠকের পর। অন্যদিকে, আরও একটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে— তৃণমূল কি ধীরে ধীরে ‘মহিলাকেন্দ্রিক’ দলে রূপান্তরিত হচ্ছে? কল্যাণের মন্তব্য, “এই দলে মহিলারাই মুখ্য, পুরুষদের কোনও গুরুত্ব নেই।” এই কথাতেই যেন স্পষ্ট হচ্ছে তাঁর হতাশা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত অভিমান নয়, দলীয় গঠনতন্ত্র নিয়েও এক ধরনের প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। এখন দেখার, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোচনার পর কল্যাণ কি তাঁর ইস্তফা প্রত্যাহার করেন, নাকি এই ঘটনা আরও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় তৃণমূলের অন্দরমহলে।

RELATED Articles