বাংলার বর্তমান মূল ধারার রাজনীতিতে বাংলার মানুষ বিরক্ত। মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা প্রকট। বিকল্প নেই কিছুই, রাজনৈতিক শূন্যতা গভীর। স্বচ্ছ বা দূরদর্শী নেতা-নেত্রীর বড়ই অভাব। তাছাড়া, এই বাংলা ভাষার ভিত্তিতে তৈরি হলেও এখানে বাঙালির কথা ভাবে না বাংলার রাজনৈতিক দলগুলো। বাঙালি ঘরে জন্মানো নেতা-মন্ত্রীরা বাঙালির কথা ভাবতেই ভুলে গেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বাংলার মূল ধারার রাজনীতিতে বাঙালি কেন্দ্রীক রাজনীতি হয়নি বাংলায়। কিংবদন্তী কংগ্রেস নেতা গণিখান চৌধুরী, সিপিআইএম নেতা অশোক মিত্র এবং বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু নেতা-নেত্রী ছাড়া কোনো নেতাই সেভাবে বাঙালির হয়ে ওঠেনি। বাঙালির নক্ষত্র চিত্তরঞ্জন দাশ ও শরৎ বসুর রাজনীতির ধারা এই বাংলায় কেউ সেভাবে বহন করেনি, ব্রাত্য রয়েছে ৭০ বছর। মূল ধারার রাজনীতির বাইরে নানা সংগঠন চেষ্টা করলেও তা মূলত সাংস্কৃতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। সার্বিক ভাবে বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতি হয়নি এই বাংলায়। অর্থনীতি কেন্দ্রিক আন্দোলন না হলে তা প্রভাব বেশি ফেলে না৷
কংগ্রেস আমলে নেতাদের দিল্লীর নেতাদের ভৃত্য হিসাবে কাজ করা মানে দিল্লীর হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ বাংলার প্রভূত ক্ষতি করেছে। বাম আমলে বাঙালি কথাটা উচ্চারণই পাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতির কথা বাদই দিন৷ আর বর্তমানে শাসক দল মাড়োয়াড়ি পুঁজি এবং জনবিন্যাসের বদলের কাছে নতিস্বীকার করেছে। এটাই বাস্তব, এটাই সত্য। স্বাধীনতার পর থেকে ক্রমাগত বাংলায় পুঁজির দখল মাড়োয়াড়ি-গুজরাটিদের হাতে কুক্ষিগত হয়। এবং তাদের বাংলায় জন্ম হার মাত্র ১.৬, অন্যদিকে বাংলার পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোয় জন্ম হার অতিরিক্ত বেশি হওয়ায় (যেমন বিহারে জন্মহার ৩.৪, উত্তর প্রদেশে ৩.৩) বাংলায় হু হু করে লোক ঢুকেছে৷ বাংলার পাশে সব অনুন্নত রাজ্য, কিন্তু জন সংখ্যার বৃদ্ধি অনেক বেশির-ফলে সমস্ত চাপ পড়েছে বাংলার উপর (মূলত কলকাতা, হাওড়া, ব্যারাকপুর, খড়গপুর, শিলিগুড়ি ও আসানসোলের উপর), মূলত বাংলার অর্থনীতির কেন্দ্র গুলোয় জন বিন্যাসের চরিত্র হু হু করে বদলেছে। এক শ্রেণীর বহিরাগত ব্যবসায়ীর ব্যবসা দখলে আগ্রাসী ও অসাধু মনোভাব, আর এক দিকে সামাজিক ভাবে অশিক্ষিত গোবলয়ের মানুষের ভিড়, গুন্ডামি, এলাকা দখল, মস্তানি-এর ফলে নিজের মাটিতেই কোনঠাসা বাঙালি। বাংলায় গত এক দশকে পার্শ্ববর্তী রাজ্য গুলো থেকে ৯২ লাখ মানুষ বাংলায় ঢুকেছে। রাজ্যের বড় শহর গুলো এবং অনেক মফস্বল শহরে বহিরাগত মানুষের সংখ্যা ৫০% বা তার বেশি। যার ফলশ্রুতিতে বাংলার ব্যবসা, চাকরি, কাজ, এলাকা দখল হয়েছে। এখন রাজনীতির নিয়ন্ত্রণও বহিরাগতদের হাতে চলে গেছে। বাঙালি নেতা-মন্ত্রীরা অনেকেই বহিরাগত ব্যবসায়ীদের পকেটে আবদ্ধ, এনাদের পয়সাতেই চলে ভোট রাজনীতি।
আবার কেন্দ্রীয় স্তরে দিল্লীর হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ সমস্ত অহিন্দি জাতিগুলোর অধিকার কেড়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানাতে চায়৷ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গুজরাটি পুঁজি ও হিন্দি লবির হাতে৷ বাংলা ভাষায় অধিকাংশ কেন্দ্র সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার অধিকার নেই। বাঙালির কাছে UPSC পরীক্ষার মাধ্যমে IAS-IPS-IRS হওয়া প্রায় দুঃসাধ্য সাধন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বড় লোন পাওয়া বাঙালির জন্য সহজ কাজ না। রাষ্ট্র বাঙালিকে অধিকার দিতে চায়না। এখন তো আবার বাঙালির রাষ্ট্র পরিচয়, নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বাঙালির ঠিকানা এখন ডিটেনশন ক্যাম্প। বাঙালিকে সমূলে ধ্বংস করতে চায় হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ।
এমনকি আমাদের রাজ্যের রাজ্য সরকারি চাকরি (ভূমিপুত্র সংরক্ষণ নেই এবং সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বাংলা বাধ্যতামূলক না), সমস্ত বেসরকারি কাজের বড় অংশ (মালিক বহিরাগত হওয়াই কাজে রাখে মূলত বিহার-ইউপি-ঝাড়খন্ডের লোকজনকে), টেন্ডার (পুঁজি মাড়োয়ারী ও গুজরাটি ব্যবসায়ীদের হাতে) কোনো কিছুতেই বাঙালির দখল নেই। বাঙালি চেতনা নেই বাঙালির ভোটে জেতা সরকারের, নেতা-মন্ত্রীদের আদর্শ বলে কিছুই নেই। যেহেতু অধিকাংশ আমলা বহিরাগত, তাই তারাও বাঙালির ভাগ্য নিয়ে ভাবিত না, অনেকেই আবার বাঙালি বিদ্বেষী, অনেকে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের সৈনিক। মূল জিনিস পুঁজি- ব্যবসা বহিরাগতদের হাতে৷ বাকিটা কল্পনা করাই যায়। আর প্রশাসনে যে সমস্ত বাঙালি অফিসার আছে তাদের অধিকাংশের মধ্যেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা নেই, যেহেতু এখানে গত ৭০ বছরে জাতীয়তাবাদের চর্চাই হয়নি। ফল ভুগছে বাঙালি। নিজভূমে পরবাসী হয়ে বেঁচে আছে বাঙালি৷ বাঙালি শুধুই ভোটার, ভোটবাক্স হয়নি বাঙালি। বহিরাগতদের হাতে মার খাচ্ছে বাঙালি, বাঙালি মহিলারা আক্রান্ত৷ মাড়োয়াড়ি ফার্মে অনেক খেটে কম টাকা মাইনে পায় বাঙালিরা, বাঙালি বিদ্বেষের শিকার হয় অনেকে। বাঙালি কৃষক ফসল ফলায়, সেই ধান কিনে মাড়োয়াড়ি মিল মালিকরা ব্যবসা করে। সব ক্ষেত্রেই তাই। সব মিলিয়ে নিজের রাজ্যে আজ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বাঙালির।
অন্যান্য অহিন্দি রাজ্যে এই সমস্যা কম। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ কেন্দ্রীয় ভাবে বঞ্চনা করে, কিন্তু বেশিরভাগ অহিন্দি রাজ্যের রাজ্য সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা আছে, মানুষও সচেতন। তাই তাদের অবস্থা আমাদের থেকে অনেক ভালো। তাহলে, বাংলায় এই সমস্যার সমাধান কি? বাংলার রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিস্তারই বাঙালির সমস্যা কমাতে পারে। ভোটে লড়া মূল ধারার রাজনৈতিক দল গুলো সহজে এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাস্তায় সামিল হবে না। কারণ ভোটের অংক, মাঠে গুণ্ডাগিরি করা মস্তান, ভোটে লড়ার টাকা আসল ফ্যাক্টর। বহিরাগতরা বাংলায় ভীষণ ঐক্যবদ্ধ৷ যেসব দল বাঙালি দরদী সাজছে, সবটাই ধান্দায়, ভেতরে বাঙালি চেতনা নেই। সুযোগ বুঝে বাঙালিকে বিপদে ফেলতে এরা পিছপা না। ভোট রাজনীতি ছাড়াও রাজনীতি হয়। বিকল্প রাজনীতি হিসাবে বাঙালির স্বার্থে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটাতে হবে এই বাংলায়। এই দায়িত্ব ভোট রাজনীতির বাইরে থাকা সংগঠন গুলোকেই নিতে হবে। বাঙালি চেতনা বাড়লে, চাকরির পরীক্ষায় বাংলা বাধ্যতামূলক হলে, বাঙালির এই প্রজন্ম ব্যবসায় গেলে- ধীরে ধীরে বদলাবে পরিস্থিতি। ভোটে লড়া রাজনৈতিক দল গুলো তখন বাধ্য হবে বাঙালির স্বার্থে কথা বলতে ও নীতি নির্ধারন করতে। এটা সম্ভব, সঠিক পথে এগোলে আগামী পাঁচ বছরে বদলে যাবে বাঙালির ভাগ্য।
আশার কথা, বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালি জাতিসত্তার লড়াই শুরু হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঢেউ উঠতে শুরু করেছে। কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ সময়ের দাবি এবং বাংলার ভবিষ্যত।
[bs-quote quote=”প্রতিবেদনটি লিখেছেন ” style=”style-4″ align=”center” author_name=”কৌশিক মাইতি ” author_job=”বাংলা পক্ষ, সহযোদ্ধা ” author_avatar=”https://khabor24x7.com/wp-content/uploads/2020/04/imresizer.com-2.jpg”][/bs-quote]
প্রতিবেদনটির মতামত সম্পূর্ণ লেখকের ব্যক্তিগত






‘ভগবান শুধু আশা দেন, কাজ কিছুই করেন না!’ ঈশ্বরকে নিয়ে বিস্ফো’রক জাভেদ আখতার